‘নির্বাকের পাশে’ বইটা যদি না পড়তাম, তবে একটা ভালো বইপড়া থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতাম, ভাগ্যিস তা হয়নি!

নির্বাকের পাশে‘ একটা শিরোনাম, একটা বইয়ের নাম।
কী? নামটা সুন্দর না?
অবশ্যই সুন্দর।

বইয়ের প্রচ্ছদটাও সুন্দর। অদ্ভুতরকম সুন্দর। প্রচ্ছদ করেছেন মাহফুজ রহমান। তাকে চিনতাম অন্য পরিচয়ে। একবার লেখক দন্তস্য রওশন ভাই বললেন, মাসুম, ভূত টুত এলিয়েন টেলিয়েন এর প্রচ্ছদ মাহফুজকে করতে দিছি। আমি ভ্রু কুঁচকে বলি, সে আবার কে?
রওশন ভাই বলেন, আরে, আমাদের মাহফুজ…। ও ও করতে করতে আমি মাথা চুলকে বলি, (লেখক) প্রচ্ছদও করে! জানা ছিল না। পরে রওশন ভাইয়ের বইটার প্রচ্ছদ দেখে ভালো লাগেছিল। 

হ্যাঁ, ‘নির্বাকের পাশে‘ বইয়ের প্রচ্ছদটাও দারুণরকম সুন্দর। এরকম একটা প্রচ্ছদ যেকোনো লেখকেরই দেখে লোভ হবে, আমার হয়, হয়েছে। তবে লেখক মোজাহিদুল ইসলামকে চেনা-ই হতো না, যদি না, এই বইটা হাতে না পেতাম, না পড়তাম! বইয়ের নাম, প্রচ্ছদ, আর বইয়ের কোয়ালিটি তিনটাই সুন্দর। এই বইটা পড়ার অন্যতম কারণ, স্বপ্ন’৭১ এর বইয়ের মান সুন্দর হয়। বইটা হাতে নিতেও ভালো লাগে। তাই পড়া।

বইয়ের প্রসঙ্গকথায় লেখক মোজাহিদুল ইসলাম বই প্রকাশ ও নিজের লেখা নিয়ে অল্প করে একটা অনুভূতি প্রকাশ করেছেন, যার সঙ্গে আমিও সহমত প্রকাশ করছি। একজন পাঠক হিসেবে অন্য অনেক বইয়ের ভিড়ে আমি এই বইটি পড়ব কেন?

আসলেই বাস্তব ও সত্য একটি প্রশ্ন। এত এত বই কোনটা রেখে কোনটা পড়ি, ঠিক করে উঠতে পারি না।

অনেক সময় কত বই যে আমাদের আড়ালে হারিয়ে যায়, যার অনেকটা অন্যের দোষে, অনেকটা নিজেদের দোষে, এই যেমন, এই বইটাও যদি না পড়তাম, তাহলে একটা ভালো বই এবং একজন সত্যিকার লেখককে আমি হারিয়ে ফেলতাম। ভাগ্যিস তা হয়নি!

এর জন্য প্রথমে ধন্যবাদ আমাকেই দিচ্ছি, কারণ, আমি বই পড়তে ভালোবাসি। দ্বিতীয় ধন্যবাদ স্বপ্ন’৭১ প্রকাশনকে এত সুন্দর করে বইটা প্রকাশ করার জন্য। আর শেষ ধন্যবাদ জানাই লেখক মোজাহিদুল ইসলামকে, এত সুন্দর করে গল্পগুলো লেখার জন্য।

লেখক ভাই, চুপিচুপি আপনাকে বলি, আমি অনেক বই বা লেখা পড়ে বিরক্ত হই, বা হয়েছিও, কী ছাইপাশ যে লেখে, কেন লেভে, কীভাবে লেখে বুঝি না! অনেক বিখ্যাত লেখকের লেখাও আমাকে টানেনি, উল্টো বিরক্তি উপহার দিয়েছে। কিন্তু আপনার এই বইটা আমাকে এক মুহূর্তের জন্যও বিরক্ত করেনি।

বিরক্ত হওয়ার মতো একটা লাইন বা প্যারা নেই লেখায়। প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা বাক্য দিয়ে খুব সুন্দর করে একটা মালা গাঁথতে পেরেছেন আপনি।

শব্দ দিয়ে এই মালা গাথাটাই লেখকের কাজ, অনেকে পারে, অনেকে পারে না। যারা পারে না, তাদের লেখা আমাকে (পাঠককে) ছুঁয়ে যায় না।

আমি যে-ধরণের লেখা পড়তে বেশি পছন্দ করি ঠিক তেমন ভঙ্গির লেখাই এ বইয়ের গল্পগুলো। তবে দুটি গল্প বাদে। ‘ক্ষয়’ ও আরও ‘খানিকটা ঝড়’ এই গল্প দুটি বাদে বাকি ছয়টা গল্পতে আমার পুরো মুগ্ধতা রয়েছে জানবেন।

অবশ্য এই ব্যাপারে একটা কথা বলতে পারি, একটা বইয়ের সবগুলো লেখা সমান ভালো হলে পাঠক ভালোলাগা বা মন্দলাগার তফাত করতে হিমশিম খায়। সে দৃষ্টিতে, ওই গল্প দুটি বইয়ের জায়গা করে নিয়ে ভালোই করেছে। এই হলো আমার সরল উপলব্ধি।

বইটা সম্পর্কে এইটুকুই আমার সমালোচনা পর্ব।

এর বাইরে আলোচনা-সমালোচনার মাপকাঠিতে যাওয়ার সাধ্য আমার নেই, আমি কেবল মুগ্ধতার কথা বলতে পারি। সেটুকুুই বলতে চাই—

গল্পে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করাই লেখকের কাজ, যা অনেকেই পারে না, অনেকের লেখায় থাকে না, আপনার লেখায় সে প্রাণটা ছিল। লেখাগুলো নিছক লেখা ছিল না, ছিল লেখকের দেখার চোখে, ছিল অনুভূতি, ছিল মানুষকে দেখার চোখে, জীবনকে বোঝার বোধ, ছিল মানুষের চোখের ভাষা পড়ার ক্ষমতা, মানুষের বুকের ভেতরটা দেখার মতো চোখ ও মন, ছিল শিল্প। সেকারণেই গল্পগুলো পড়তে কেমন মায়া মায়া লাগছিলো। পাঠক লেখায় এই মায়াটাই খুঁজে ফেরে, নয়ত, কার এমন ঠেকা যে, বসে-বসে সাদা কাগজের কালির অক্ষরে মুগ্ধতা, আনন্দ খুঁজে ফেরে!? 

লেখককে বলি, আপনার উৎসর্গ পাতাটার মতো এইসব বিপণ্ন, বিষণ্ন, কিছু না-পাওয়া হাসিমুখে জীবনটা যাপন করে যাওয়া মানুষের গল্প-ই লিখবেন। এটা আপনার কলমে দারুণ ফুটবে বলে বিশ্বাস করি। আশাও করছি।

প্রথম গল্পে আশালতা আর মঞ্জু মিয়া হাত ধরে হাঁটছে। তাদের এই হাত ধরে হাঁটাটাই আমাদের চাওয়া। এই আমাদের পছন্দ।

দ্বিতীয় গল্পে পাশের ঘর থেকে হামিদুলের মায়ের কান্নার শব্দ শোনা যায়।
তারপর?
তার আর পর নেই। কোথায় থামতে হয় লেখককে জানতে হয়। ধন্যবাদ লেখক।

তৃতীয় গল্পে রেজোয়ানার প্রতিশোধটা ঠিকঠাক। ঠিক কাজ করেছে মেয়েটা। ইতর-লম্পটের কোনো ক্ষমা নেই।

ষষ্ঠ গল্পে মোজাফফরের মঙ্গল হোক, মোজাফফদের জীবনে মঙ্গল কামনা করার জন্য লেখকে আবারও ধন্যবাদ।
শেষমেশ মোজাফফরে কতটুকু মঙ্গল হলো, তা জানতে হলে পাঠককে বইটি পড়তে হবে—

আরও যে কারণে বইটি আপনাকে পড়তে বাধ্য করবে, অনেক না পাওয়া নিয়ে বেচে থাকা মানুষেরা আসলে বী পায়, কেন বেঁচে থাকে প্রতিদিন? আশালতার বুক ভারী হয়ে আসে, মঞ্জু মিয়া কী ভালো আছে? একজন শবাদ, বাক্য, ভাষাহীন মানুষের পাশে হাঁটতে দেখা যায় কাউকে। সেই মানুষটা কেমন আছে? পাশের ঘর থেকে কান্নার শব্দ শুনে হামিদুলের কেমন লাগে? এক খোঁয়াড়ে থেকে মুক্তি পেয়ে যেন আরেক খোঁয়াড়ে রেজোয়ানা ঢুকে পড়ে। সেই জীবনটা কেমন?
তালেব কী বাড়ি ফিরতে পারবে? কান্তার জন্য কী সত্যি শাফায়েতের খারাপ লাগে? ফোন রিসিভ করে সুবীর কী পেল?

হে মহান পাঠক, আপনি এত কিছু করেন, সে-ই অনেককিছুর মাঝে খানিকটা সময় বই পড়ার জন্য ব্যয় করবেন, আপনার কাছে আমরা এইটুকু সময় চেয়ে নিতেই পারি, তাই না?

বইয়ের নাম : নির্বাকের পাশে
লেখক: মোজাহিদুল ইসলাম
বইয়ের ধরণ : ছোটগল্প
প্রচ্ছদ : মাহফুজ রহমান
প্রকাশনী : স্বপ্ন’৭১ প্রকাশন
প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০২৪
পৃষ্ঠা : ১২০
মূল্য : ৩০০ টাকা
বইটি পাওয়া যাবে কাঁটাবনের স্বপ্ন ‘৭১ অফিসে ও রকমারি ডটকমে।
সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন  : +৮৮০১৭৩৭৩৭৩৮৬০।

আরও পড়ুন