চাক ভাষা চর্চা ও চাক বাংলা অভিধান

বাংলাদেশে বহু ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের বসবাস রয়েছে। ভাষা ও সংস্কৃতির বৈচিত্রতা মানুষকে করে তোলে নিজ নিজ ক্ষেত্রে সৃজনশীল ও অনন্য। বাংলাদেশে বেশ কিছু জনগোষ্ঠীর ভাষা বিপন্ন ভাষার তালিকায় রয়েছে। তার মধ্যে জনসংখ্যার বিচারে চাক ভাষাও রয়েছে। বিশ্ব ভাষার গবেষণা প্রতিষ্ঠান আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট বিপন্নপ্রায় ভাষা সংরক্ষণে বেশ কিছু উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। তাঁর মধ্যে বিপন্নপ্রায় ভাষার অভিধান প্রণয়ন অন্যতম। ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রথমবারের মতন প্রণয়ন করেন বেদে জনগোষ্ঠীর ভাষা নিয়ে রচিত ‘ঠার বাংলা’ অভিধান। অভিধানটি লিখেছেন কবি ও গবেষক রঞ্জনা বিশ্বাস। এটিই আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট থেকে প্রকাশিত প্রথম অভিধান গ্রন্থ। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি তাদের এই ধারা অব্যহত রেখেছেন; এবারের বই মেলায় প্রকাশ করেছেন চাক বাংলা অভিধান।
চাকরা বাংলাদেশের বান্দরবান জেলায় বাস করে। এছাড়া মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে তাদের বসতি রয়েছে। চাকদের বলা হয় সাক বা মিঙসাক। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইশারি, নাইক্ষ্যংছড়ি, আলিখ্যং, কামিছড়া, কোয়াংঝিরি, বাকখালী, দোছড়ি, বাদুরঝিরি, ক্রোক্ষ্যং প্রভৃতি জায়গায় চাক জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তিনটি ইউনিয়নে ১৪টি পাড়ায় চাকদের বাস। রাঙামাটি বা খাগড়াছড়ি জেলায় চাকদের কয়েকটি পরিবার বিক্ষিপ্তভাবে শহরের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বসবাস করে। মেধাবী তরুণ ছাগ্যহ্লা চাক চাকভাষায় অনুবাদ করেছেন জাতীয় সংগীত এবং গীতিকার আবদুল গাফফার চৌধুরী’র লেখা আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি গানটি। বতর্মানে চাক ভাষা ও জাতিগোষ্ঠীর ‘পাইক চুং’ ব্যান্ড এর প্রধান ভোকালিস্ট হয়ে গান রচনা, সুর ও কন্ঠ দিচ্ছে এই তরুণ। সম্প্রতি তাঁর পরিচালনায় ইউটিউব চ্যানেল ’চাক ফিল্মস’ প্রকাশ পেয়েছে চাক ভাষায় গান ও নাটক। চাক সমাজে অন্যান্য তরুণ শিল্পী, মডেল, গায়কদের মধ্যে রয়েছে- জীবন চাক, উখ্যাইচিং চাক, য়াইনুপ্রুফ চাক, ও মিয়া সাইন চাক, চিংমংলা চাক, চাইল্যাগ্য চাক। বাংলাদেশে বসবাসকারী চাকদের কোনো লিখিত বর্ণমালা ছিল না। সুদীর্ঘ বিশ বছর গবেষণা করে ২০১১ সালে চাকদের এই বর্ণমালা আবিষ্কার করেছেন মংমং চাক। তিনিই প্রথম চাকদের বর্ণমালা উদ্ভাবন করেন।
চাক ভাষার সমাজচিন্তক ও গবেষক, জনাব চিংলামং চাক এর মতে কাডু, কানাং জাতির সাথে চাক ভাষার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ মিল রয়েছে যেমন-উতি,উছা,ই ক্রু হে, লাংগা স্থলে লাংমে, তানা কে তাঙা ইত্যাদি হুবহু মিল রয়েছে।’ জনাব চিংলামং চাক জানান বর্তমানে এই নিয়ে বারমা ও সাক জাতির মধ্যে আলোচনা ও গবেষণা চলছে। এবারের বই মেলায় বিশ্ব ভাষার গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট’ প্রকাশ করেছে চাক বাংলা অভিধান। এই অভিধানে প্রায় ১২০০ শব্দ রয়েছে। এই শব্দের ভেতরে যেমন একক চাক শব্দ রয়েছে তেমনি আছে মারমা, রাখাইন ও বার্মিজ ভাষার শব্দ। চাকভাষীদের নিজস্ব মৌলিক চাকের সঙ্গে এই সকল শব্দগুলো নানা প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে। চাক ভাষীদেরও সঙ্গে কথপোকথনের ভিত্তিতে এবং চাকভাষা সম্পর্কে কিছু বইপত্র থেকে শব্দগুলো এখানে সঙ্কলিত হয়েছে। যেমন: চাক ভাষার সংখ্যাবাচক শব্দ এবং প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে ‘আনোঃতু সনিংগাঃ, অংখ্যাই চাক’ বই থেকে। কিছু শব্দ পাওয়া গেছে ’বাংলাদেশের নানান ভাষা; মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, পৃষ্ঠা নম্বর ২৯; প্রথমা প্রকাশন; প্রথম প্রকাশ অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৪’ থেকে। চাক গোষ্ঠীর মেধাবী শিল্পী ছাগ্যহ্লা চাক দুটি গান ‘বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত এবং একুশের গান’ চাক ভাষায় অনুবাদ করেছেন। সেখান থেকেও কিছু চাক শব্দ পাওয়া যায়। চাকভাষীদের উচ্চারণের আদলেই এই শব্দগুলোর উচ্চারণরীতি দেখানো হয়েছে। এই উচ্চারণ রীতিতে আই.পি. এ. অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ধ্বনি ও বর্ণমালা ব্যবহার না করে বাংলা বর্ণমালা ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি শব্দের অর্থ জ্ঞাপন করার পাশাপাশি প্রয়োগ বাক্যের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। শব্দগুলো বাংলা অভিধানের বর্ণানুক্রম অনুসারে সাজানো হয়েছে। শব্দের বানান ও উদাহরণ বাংলা ভাষায় লেখা হয়েছে।
চাক বাংলা অভিধান প্রকাশে আনন্দ প্রকাশ করেন, চাক সমাজের জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর মংচিংহ্লা চাক (জীবন চাক)। তিনি বলেন, ‘চাক বাংলা’ অভিধানের বিষয়বস্তু আমার ভালো লেগেছে, বইটি আমার এবং চাকসমাজের জন্য অনেক কাজে আসবে।’
চাক ভাষা শিক্ষাকে ছড়িয়ে দিতে ইতিমধ্যে উদ্যোগ হাতে নিয়েছেন বান্দরবান, নাইক্ষ্যংছড়ির তাংরা বিছামারা সরকারি বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক চাইহ্লা অং চাক এবং তাঁর সহধর্মিনী প্রশিক্ষক মাচৌ চাক। মোট ২৮ জন শির্ক্ষাথীকে তারাঁ চাক ভাষা নিয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। তাঁদের এই উদ্যোগ চাক ভাষা সংরক্ষণে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও চাক সমাজের মানুষেরা থেমে নেই। আশা করছি থেমে থাকবেনা।
বইটি চাক জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
