মানুষের ডেরায় স্বপ্নের খুঁটি: স্বপ্ন ও বাস্তবতার আখ্যান

কলমের আঁচড়ে বাংলা সাহিত্যকে যিনি দিনে দিনে তাঁর লেখনির মাধ্যমে সমৃদ্ধ করে তুলেছেন পাশাপাশি বাংলা সাহিত্য যাঁর কাছে ঋণী হয়ে যাচ্ছে তিনি আধুনিক সময়ের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন (১৯৪৭)। স্কুল জীবনে তাঁর লেখালেখি শুরু কবিতা লেখার মধ্যে দিয়ে হলেও বর্তমানে তিনি উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা, শিশুতোষ গ্রন্থ, অনুবাদ সাহিত্যসহ সম্পাদনার কাজও করে চলেছেন। সাহিত্যের অঙ্গনে এই খ্যাতিমান লেখক যত সাহিত্য রচনা করেছেন, তাঁর সেই প্রতিটি লেখায় তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন দেশ, কাল, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতিসহ নানা মাত্রিক বিষয়। আবার তিনি সমাজের নানা অনুষঙ্গ ব্যবহার করে সাহিত্যকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, রীতি-নীতি, চিন্তা-চেতনা, শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং ইতিহাস-ঐতিহ্য সেলিনা হোসেনের সাহিত্যে প্রতিফলিত হয় শৈল্পিক সৌন্দর্যে: যার প্রমাণ পাওয়া যায় তার বিভিন্ন গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধে। সেলিনা হোসেনকে লেখক বা কথাসাহিত্যিক বললে কম বলা হবে। তাঁর পৌনঃপুনিক স্থান-কাল, ইতিহাস ব্যবহারের সাহিত্যিক নির্মাণ বাংলা সাহিত্যকে যতটা সমৃদ্ধ করেছে, তার চেয়ে বেশি আলোড়িত করেছে পাঠকের হৃদয়। বাঙালির অহংকার ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ তাঁর লেখায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ‘স্বপ্ন ৭১ প্রকাশন’ থেকে তাঁর প্রকাশিত অন্যতম একটি কাজ মানুষের ডেরায় স্বপ্নের খুঁটি (২০২২) গল্পগ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করব। যে গল্প পড়ে বারবার বিবেকের কাছে নাড়া দিয়েছে, শিহরিত করেছে মানবিক দিকগুলো। গল্প নিয়ে কথা বলার আগে অবশ্যই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি ‘স্বপ্ন ৭১ প্রকাশনের কাছে এমন সুন্দর একটি বই পাঠকের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য।
‘ছেলেটির বয়স ছাব্বিশ’ গল্পে লেখক সেলিনা হোসেন মুক্তিযোদ্ধা গোফরান মিয়া চায়ের দোকানকে কেন্দ্র করে গল্পে শুরু এবং শেষ করেছেন। লেখক গোফরান মিয়াকে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অংকন করেছেন। সে এখন বেশি কাজ করতে পারেনা। তাই এই বৃদ্ধ বয়েসে এসেও সে সৎ ভাবে বেঁচে থাকার জন্য একটি চায়ের দোকান দিয়েছে। তবে তার চায়ের দোকান থেকে কেউ চা খেয়ে টাকা দেয়, আবার কেউ টাকা না দিয়ে চলে যায়। গল্পে অন্যতম চরিত্র গোফরান মিয়া, কুদ্দুস দফাদার, হাসিতুন ও হাসিতুনের ছেলে মাসুম এবং ছাব্বিশ বছর বয়সের একটি যুবক। একদিন গোফরান মিয়া তার মেয়ে নাতি নিয়ে দেখা যায় চায়ের দেকানের সামনে একটি সাইনবোর্ড দিয়েছে যেখানে লেখা গল্পের ভাষায়:
‘মেয়ে নাতিসহ বড় বড় করে লেখে, মুক্তিযোদ্ধা গোফরান মিয়ার চায়ের দোকান।’ [ছেলেটির বয়স ছাব্বিশ: গল্প]
দোকানের নাম দেখে অনেকেই যেমন বিস্মিত হয় তেমনি অনেকের মত কুদ্দুস দফাদারের চোখের পলক পড়ে না। মুক্তিযোদ্ধাদের মানুষ যে কেমন সম্মান করে তার একটি দৃষ্টান্ত লেখক তুলে ধরেছেন। গল্পের ভাষায়:
‘পরক্ষণে সে গোফরানের পাশে এস বসে বলে, আপনি একজন মুক্তিযোদ্ধা? আমাকে মাফ করে দিয়েন। আমি জানতাম না। আপনার কাছ থেকে যত চা খেয়েছি, তার দাম কড়ায়-গণ্ডায় দিয়ে যাব। সেলাম!’ [ছেলেটির বয়স ছাব্বিশ: গল্প]
গল্পে দেখা যায় কুদ্দুসের মত আরো একটি চরিত্র ছাব্বিশ বছর বয়সী ছেলে। যাঁর বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। গোফরান মিয়া সাইনবোর্ড যত দিন না দিয়েছে ,ততোদিন সে অজানা এই গোফরান মিয়াকে ভয় দেখিয়েছে। সাইনবোর্ড দেখার পর সে তার সম্পর্কে সব কথা খুলে বলে এবং গোফরান মিয়ার কাছে সে মাফ চাই। স্বাধীন দেশে কিছু মানুষ তাদের নিজেদের ব্যক্তির স্বার্থকে হাসিল করার জন্য কিছু ভালো মানুষকে ব্যবহার করেছে বা এখনও করছে তার একটি দৃষ্টান্ত এই ছাব্বিশ বছরের ছেলেটি। গল্পের ভাষায়:
‘সে কাঁদতে কাঁদতে বলে, আমাকে কেউ কেউ সন্ত্রাসী বানিয়েছে। তাদের হুকুম পালন করেছি। ডাকাতি-রাহাজানি-খুন কিছুই তো বাদ রাখিনি। কেউ আমাকে ভালো থাকতে দেয়নি।’ [ছেলেটির বয়স ছাব্বিশ: গল্প]
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে নারী কতটা অরক্ষিত তার একটি দৃষ্টান্ত এই ‘কেঁদো না’ গল্প। স্বাধীন দেশে তারাবন পরিবার থেকে বিতাড়িত হয়। তারাবন মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি ক্যাম্পে থেকে যুদ্ধ করেছে। কিন্তু মৃত্যুর পর তার লাশ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের চেষ্টা করলেও সেটা সম্ভব হয়নি। গল্পে বর্ণিত:
‘চেয়ারম্যানের কথা: মেয়ে মানুষ, তাও আবার মুক্তিযোদ্ধা। …
নির্যাতিত নারীদের জন্য রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নাই। আপনি আসুন।’ [কেঁদো না: গল্প]
উক্তিটিতে যুদ্ধকালীন সময়ে নারী শুধু সামাজিক, পারিবারিক টানাপোড়েন নয়, মানসিক ভাবে হতে হয়েছে হেনস্তার শিকার তারই চিত্র বহন করে।
মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে সমরশাসকের মদদপুষ্ট ভাড়াটে কুশিলবদের দৌরাত্মের বৃহত্তর জনজীবন অপশাসন ও শোষণের নগ্নরূপ প্রদর্শিত হয়েছে গল্পে। সঙ্গে সঙ্গে বিরোধী শক্তিদের ঔদ্ধত্য সাহসের বিষয়েও উঠে এসছে। লেখকের ভাষায়:
‘আপনার বাবা বোধ হয় যুদ্ধের সময় রাজাকার ছিলেন। হ্যাঁ, ছিলেন। শান্তি বাহিনীর চেয়ারম্যান ছিলেন।’ [কেঁদো না: গল্প]
‘যুদ্ধক্ষেত্র’ গল্পে লেখক একজন মুক্তিযোদ্ধা নারীর জীবন সংগ্রামের ইতিহাস বর্ণনা করেছে। সুরবালা নামের চরিত্রে দেখিয়েছেন কীভাবে একজন নারী যুদ্ধে অবদান রেখেছে। যেখানে তার মোসলেমের সাথে চিরাচরিত নারীর মত সংসার করার সময় ছিল। কিন্তু সুরবালার মত হাজারো নারী এদশের স্বাধীনতার জন্য, অপশক্তির হাত থেকে এদেশকে মুক্ত করার জন্য নিজেদের সম্ভ্রম পর্যন্ত দিয়েছে। কিন্তু এ সমাজ তাদের মনে রাখেনি। শুধু ভালোবাসার জন্য মোসলেম হয়তো তাকে মনে রেখেছে। এদেশকে স্বাধীন করার জন্য নিজেদের সর্বস্ব দিয়েছে তারই দৃষ্টান্ত:
‘ওদের মুখে থুতু দিতাম। তারপর ওরা আমাকে ব্লেড দিয়ে কাটত। দেখো আমার শরীলে কত লম্বা লম্বা কাটা দাগ। এই রক্তে নদী দিয়েছি বলেই তো এদশে স্বাধীন হয়েছে।’ [যুদ্ধক্ষেত্র: গল্প]
স্বাধীনতা অর্জন করতে গিয়ে নারীদেরকে হতে হয়েছে হানাদার বাহিনীর লালসার বস্তু। নিজ বস্ত্রটুকু রাখতে পারেনি। গল্পের আলোকে:
‘মাসি তুমি ন্যাংটো হয়ে যাচ্ছো। মাসিগো-
… শাড়ির একটা ছেড়া টুকরো মাত্র আমি রাখতে পেরেছি।
…চারদিকে ওর কণ্ঠস্বর ভেসে বেড়ায়।
বলে, সুরবালাতো কবেই ন্যাংটো হয়ে গেছে।’ [যুদ্ধক্ষেত্র: গল্প]
যুদ্ধ কেবল একজন মানুষের জীবনের স্বাধীনতা নয়, হয়ে উঠেছে প্রাণের চেয়ে প্রিয়। মানচিত্র হয়ে উঠেছে গৌরবের বিষয়। ‘সমাবেশ’ গল্পে তারই ইঙ্গিত পাওয়া যায়:
‘এইডা তোমারে দিলাম। যতন কইরা রাখবা। যুদ্ধের সময় আমি এইডা বুকের লগে বাইন্দা রাখতাম। হাসিমুখে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল নসিমন। দুই হাতে পতাকাটা আকড়ে ধরে বলেছিল, পতাকা! হ, এইডার লাইগা যুদ্ধ করছি।’ [সমাবেশ: গল্প]
তারা যুদ্ধ করেছিল একটি ভূণ্ডের জন্য, একটি পতাকার জন্য, পরাধীনতা থেকে নিজেদের মুক্তির জন্য। তারা ভেবেছিল দেশ স্বাধীন হলে সুখে-শান্তিতে থাকতে পারবে। কিন্তু তাদের ইচ্ছাগুলো সব ধূসর হয়ে যাচ্ছে ক্রমে ক্রমে। তবু পরিশ্রমের মাধ্যমে তারা ভালো কিছু করবে তৈয়ব আলীর সংসারে সেই সংকেত পাওয়া যায়। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা কাউরে ভয় পায় না। তৈয়বের ভাষায় সেটি উঠে আসে। গল্পের ভাষায়:
‘খান খান । মুক্তিযোদ্ধার হাতের চা খাইলে রাজাকারের গর্জনে ভিরমি খাইবেন না।
ভিরমি! খামোশ।
মুক্তিযোদ্ধা ভিরমি খায়না।’ [সমাবেশ: গল্প]
একজন মুক্তিযোদ্ধা স্বাধীন ভাবে বাঁচতে চাই, সম্মান চাই, সে মুত্যুর পর খেতাব চাইনা। দেশ স্বাধীন করেছে যে অন্ন, বস্ত্র, নিজের অধিকারের জন্য সেটা যদি না পাই তাহলে এই যুদ্ধের কোন মানে হয়না। মুক্তিযুদ্ধের অর্জন আর ব্যর্থতাকে এগল্পে বাস্তবতার বিশ্লেষণে প্রয়াসী হয়েছেন লেখক। যে কাঙ্খিত স্বর্ণস্বদেশের বিনির্মানের প্রত্যাশায় এদেশের নিম্মবর্গের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে তাদের সেই প্রত্যাশা ও স্বপ্নসাধের ঘটেছে নির্মম পরাভব। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী বিপ্লবে যাদের অবদান ছিল অতুলনীয় স্বাধীন দেশে তারাই ক্রমশ অনিশ্চিয়তার অতল অন্ধকারে হয়েছে নিমজ্জিত। রণাঙ্গনের বিজয়ী বীর সৈনিকের স্বাধীন দেশে হয়নি জীবিকার ও চিকিৎসার সুব্যবস্থা। গল্পের ভাষায়:
‘যুদ্ধের সময় একটি বুলেট ঊরুতে ঢুকেছিল ওটাকে বের করা হয়নি। এখনো আছে। বড় কষ্ট হয় রিকশা চালিয়ে এত বড় সংসার চালাতে।’ [সমাবেশ: গল্প]
‘চার বন্ধুর বিলাপ’ গল্পে চারবন্ধুর কথোপকথনে গল্প শুরু হলেও নিশ্বাস শেষ না হতেই দেখা যাবে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যুদ্ধে অংশ নেওয়া পরিবারের সদস্যদের মনে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির প্রতি তাদের ঘৃণা কেমন সেই চিত্র। যেখানে বাশার চরিত্রটির মাধ্যমে লেখক ফুঁটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছে স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রতি ঘৃণা আর আক্রোশ। গল্পের ভাষায়:
‘তোরা যারা স্বাধীনতা যুদ্ধে পরিবারের কাউকে শহীদ হতে দেখিসনি , তারা বুঝবি না স্বাধীনতা বিরোধীদের জন্য আমাদের ঘৃণা কত প্রবল।’ [চার বন্ধুর বিলাপ: গল্প]
গল্পগ্রন্থের নামে নামাঙ্কিত গল্প ‘মানুষের ডেরায় স্বপ্নের খুঁটি’ গল্পে একজন আমিন উদ্দিন এর আঁকা ক্যানভাসের মাধ্যমে লেখক মুক্তিযুদ্ধে সকল শহীদদের চিত্র এঁকেছেন। তিনি দেখিয়েছেন এই গল্পে ছোট ক্যানভাসে কিভাবে শহীদদের মুখচ্ছবি দেখা যায়। একজন সোহেলী চরিত্র অংঙ্কনের মাধ্যমে লেখক মনে করিয়ে দেই স্বাধীনতা যুদ্ধে তাদের অবদানের কথা। গল্পের ভাষায়:
‘সোহেলিকে স্বাধীনতার অর্জনের জন্য কঠিন পথে যেতে হয়েছিল মার্টিন। হ্যাঁ, হয়েছিল। আমি জানি। যুদ্ধের এটাই নিয়ম।’ [মানুষের ডেরায় স্বপ্নের খুঁটি: গল্প]
‘কবরে ছড়ানো বুনো ফুল’ গল্পে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর ভয়ে একটি পরিবারের বাড়ি ত্যাগ করা এবং সেই সাথে যাত্রা পথে তাদের পরিবারের নতুন সদ্যস্যের আগমন: সাথে সাথে তার পরিসমাপ্তি এবং তার স্মরণে ফুল দেওয়া ও প্রতিবছর তাকে স্মরণ করা বিষয়টি উঠে এসছে। গল্পের ভাষায়:
‘এক মুঠো ফুল আসমানির হাতে দিয়ে বলে, তুমি ওর কবরের ওপর ছিটিয়ে দাও। ওর স্মরণে আমরা প্রতিবছর ফুলদেব এখানে এসে।’ [কবরে ছড়ানো বুনো ফুল: গল্প]
মূলত লেখক সেলিনা হোসেন দেখাতে চেষ্টা করেছে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মৃত্যুর পর মৃত্যু, লাশের পর লাশ। তাদের কবর দেওয়ার মত ব্যবস্থা হয়নি সব সময়। যারা যাত্রাপথে মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের লাশটা দাহ করা বা কবর দেওয়ার লোকের অভাব। রবিউলের সন্তানের কবর দেওয়া গেলও হাজারো রবিউল, আকাশির সন্তান মৃত্যুর শেষ স্বাদটুকু পাইনি। তাদের না পাওয়ার মধ্যে দিয়ে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে।
‘দাঙ্গার রংচেতনা’ গল্পে অসাম্প্রদায়িক চেতনার ও ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পূর্বে ১৯৪৬ এর দাঙ্গার সময় বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর সেই অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিষয় ষ্পষ্ট দেখা যায় হিন্দু বাড়িতে দুটি মেয়ের মৃত্যুর পরে। গল্পের ভাষায়:
‘শিশুদের মা কাঁদতে কাঁদতে জিজ্ঞাসা করে আপনার নাম কী?
-শেখ মুজিব। আমি ইসলামিয়া কলেজে পড়ি।
আমি এই দাঙ্গা মানিনা ।
আমার কাছে হিন্দু-মুসলমান বলে কেউ নেই। সবাই মানুষ।’ [দাঙ্গার রংচেতনা: গল্প]
সহিংসতা কেবলই যুদ্ধের সশস্ত্র অস্ত্রগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সহিংসতা নিরীহ জনগণের ওপর গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। সব বয়সের নিরস্ত্র মানুষ, বিশেষ করে নারী, যারা আগ্রাসনকারীদের কোনো ক্ষতি করেনি, তাঁদের জীবন ধ্বংশপ্রাপ্ত হয়েছিল। তেমনই একটি চরিত্র ‘দুই রকম যুদ্ধ’ গল্পে নূরজাহান। যে ক্রমে ক্রমে নূরজাহান থেকে হয়ে যায় সোনাভান। সে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে । সে পাকিস্তানি সেনাদের তার শরীল দিয়েছে। গল্পের ভাষায়:
‘নূরজাহানের চুলের মুঠি ধরে বাইরে নিয়ে আসে। শুরু হয় নির্যাতন। ও চিৎকার করেনা। যতক্ষণ সহ্য করতে পারে চুপ করে থাকে। তারপর শুরু হয় গোঙ্গানি। ওর অবচেতন থেকে গোঙানির ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে ক্যাম্পে।’ [দুই রকম যুদ্ধ: গল্প]
সোনাভান তার শরীলের বিনিময়ে পাকিস্তানি ক্যাম্প থেকে তথ্য দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছে। কখনো কখনো সোনাভানেরা জীবিত ক্যাম্প থেকে পালিয়ে যেতে পেরেছে, আবার কখনো কখনো ক্যাম্পেই তাদের নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। এভাবে অসংখ্য নূরজাহান, সোনাভান এদেশে স্বাধীনতার সূর্য এনেছে জীবনের বিনিময়ে, নিজেদের শারীরিক কষ্ট সহ্য করে, এদেশকে , এদেশের মাটিকে ভালোবেসে ,তাদের প্রিয় স্বদেশের কথা চিন্তা করে, প্রিয় স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা থেকে।
মানুষের ডেরায় স্বপ্নের খুঁটি গল্প গ্রন্থে জাতি-ভেদ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংগ্রাম করেছে একটি স্বাধীন দেশের আকাক্সক্ষায়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে স্বাধীন ভাবে স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে পারেনি। নারীদের হতে হয়েছে লাঞ্চিত, অপমানিত। তারা স্বপ্ন দেখেছে কিন্তু স্বপ্নের বাস্তবায়ন পায়নি। তাই মানুষের ভিতরে এঁকে চলেছে স্বপ্নের খুঁটি।
মানুষের ডেরায় স্বপ্নের খুঁটি
সেলিনা হোসেন
প্রকাশনী: স্বপ্ন ‘৭১ প্রকাশন
মূল্য: ২৪৫ টাকা
