রোদ্দুর বিবর্ণ হলেও এক আলোক সত্তার প্রজ্ঞা

স্মৃতিমেদুর জীবনের অতীতচারিতা থেকে বারবার নিজেকে তুলে আনেন কবি অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়। ইতিহাস ঐতিহ্যের সঙ্গে তিনি তাঁর জীবনের উৎসকে খুঁজে পেতে চান। তাই তাঁর কবিতায় বারবার সেই শিকড়ের টান দেখতে পাই। সম্প্রতি ‘বিবর্ণ রোদ্দুর’ (২০২৩) কাব্যগ্রন্থটি পাঠ করতে গিয়েই কবির ভেসে যাওয়া সমস্ত ‘হৃদয় কথা’র সঙ্গেই দেখা হয়ে গেল। কবি লিখেছেন—

“বিবর্ণ রোদ্দুরের ভেতর দিয়ে যাই
অপরাহ্ন গড়িয়ে যায় নদীর মতো
অরণ্যচারিণী জীবনে
একটা হারিয়ে যাওয়া গল্প
একদিন এখানে রঙিন
প্রজাপতির মতো মেঘ ছিল
বা ছায়া ভাস্কর্যের ভেতর হলুদ ওড়না
সমুদ্র জলে হারিয়ে যাওয়া সুবর্ণ গোলক
মায়াজালের মতো নক্ষত্র সন্ধ্যা”

তখন বুঝতে পারি, যে প্রকৃতি  কবির উপলব্ধিতে রোমান্টিক বাতাবরণের আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল তা অন্তর্হিত হয়েছে। অথচ তার রেশ থেকে গেছে। রোদ্দুর বিবর্ণ হলেও সেখানে একদিন ‘বসন্ত ফুল’ ফুটেছিল। গল্প তৈরি হয়েছিল। যে গল্পের ভেতর রঙিন প্রজাপতির মতো মেঘ, ছায়া ভাস্কর্যের হলুদ ওড়না এবং মায়াজালের নক্ষত্র সন্ধ্যার উদয় হয়েছিল। যে ইতিহাস ও পটভূমির কাছে কবির এই নস্টালজিক বেদনা জেগে উঠেছে তাতে অভিমান, শূন্যতা এবং হাহাকারের দেখা মেলে। সমগ্র কাব্যজুড়ে তারই প্রশ্রয়, তারই আবহাওয়া বিরাজ করছে। 

আসলে প্রকৃতির সঙ্গে যখন প্রেমের এবং হৃদয়ের সঙ্গে যখন হৃদয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে—তখনই তা মর্মভেদী আলোক সত্যের পথে নেমে আসে। একে কিছুতেই অস্বীকার করা যায় না। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মার্কিন সাহিত্যিক উইলিয়াম কাথবার্ট ফক্‌নার বলেছেন:

“The past is never dead. It’s not even past.” 

অর্থাৎ অতীত কখনও মরে না। এটি এমনকি অতীতও নয়।

কবি অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়ও অতীতকে মৃত হিসেবে দেখতে চাননি। যে নস্টালজিয়ার প্রবাহ তাঁকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে, তিনি সেই প্রবাহের বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়ে লিখেছেন:

“মহাকর্ষের মতো একটা সম্পর্ক
বরফের মরুদ্যানের মতো
ছড়িয়ে আছে মুহূর্তগুলো
মর্মরিত রাত্রিগুলো গড়িয়ে যায়”

অথবা,
“ছায়ার মতো আঁকা একটা দুপুর”
যেখান থেকে কবি নিরীক্ষণ করেছেন—

দৃষ্টির সাথে মিশে যাওয়া একটা নদী, জলশূন্য পথে তার চলে যাওয়া, ভাবতে ভাবতে হৃদয় জুড়ে তৈরি হওয়া একটি শীতল ভূমিখণ্ড, ডিমের কুসুমের মতো সকাল। সবকিছুর মধ্যেই আছে গুচ্ছ গুচ্ছ আবেগ। রোমান্টিক বেদনার সেই অন্তর্ভেদী উপলব্ধি। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ বাক্যের মতো কথা প্রচলিত আছে—

 “Nostalgia is the pain of longing for what can never be again.”

অর্থাৎ নস্টালজিয়া হলো আকাঙ্ক্ষার বেদনা যা আর কখনও হতে পারে না। সেই আকাঙ্ক্ষাই জাগ্রত হয়ে কবিকে আচ্ছন্ন করেছে। স্মৃতিভূমিতে মননভ্রমণ করেছেন। শ্রাবণ সন্ধ্যা থেকে, বসন্ত, শরৎ থেকে হেমন্ত, সকাল থেকে গোধূলি, রোদ্দুর থেকে জোৎস্না তাঁর স্মৃতিপথকে সিক্ত করেছে। সেই পথের পথিক হয়ে পাঠকও এইসব কবিতায় আলোড়িত হবেন।

বাংলা ভাষার কবি বলেই অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়ের মনে বাংলা ভাষার ইতিহাস, বাংলা ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা, বাংলা ভাষার জন্য একটা দেশের স্বাধীনতার কথাও মনে পড়েছে। বিশ্ব মাতৃভাষা দিবসের পরিণতির এবং গৌরবের দিকচিহ্নকেও তিনি কবিতায় তুলে ধরেছেন। একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি তোমায় ভুলিতে পারি? বাঙালি আবেগের এই জীবন্ত কিংবদন্তির কাছে তিনিও প্রহরী হয়ে উঠেছেন—

“একটা আবেগ যে সমুদ্র গর্জন”

আর এই গর্জন প্রতিটি বাঙালি হৃদয়ের।একটা মানচিত্র আঁকার প্রত্যয় জাগায়। রক্তবিন্দু দিয়ে সিন্ধু তৈরি করে। সূর্যোদয়ে ফুল ফোটায়।

একই সঙ্গে ফিরে আসে বরাক নদী উনিশে মে তারিখটিও। সেখানেও কৃষ্ণচূড়া হেসে ওঠে। বাঙালির চোয়াল শক্ত হয়। ভাষার জন্য বাঙালি সবকিছু করার প্রস্তুতি নেয়।

সমগ্র কাব্যটিতেই কবির এই গৌরব ছড়িয়ে আছে। এই জীবন ছড়িয়ে আছে। এই প্রত্যয় ছড়িয়ে আছে। রোদ্দুর বিবর্ণ হলেও তাই এক আলোক সত্তার প্রজ্ঞা। ইতিহাস, ভাষা, দেশ, জীবন ও প্রেমে স্বপ্নের ডালি সাজিয়ে দিয়েছেন। সহজ সুন্দর কবিতাগুলি তাই অক্ষরবৃত্তে এত উচ্ছল ও প্রাণময়।

বিবর্ণ রোদ্দুর
অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়
রাঙামাটি প্রকাশন
কাছারিপট্টি, বোলপুর, বীরভূম
প্রচ্ছদ: সন্তু কর্মকার
মূল্য ১৬০ টাকা।

আরও পড়ুন