শাশ্বতী ভট্টাচার্য’র ১০টি কবিতা
১.
নিদানকাল
অন্ধকার ছিঁড়ে খাচ্ছে নতুন শহর।
হেনস্তা হয়েছে চোখ আলোর বিলাসে,
বিধাতাপুরুষ আর খড়ম পরে না।
থেকে থেকে কেঁদে ফেলে দোয়াত কলম
প্রদীপ জ্বালিয়ে একা বৃদ্ধ ইতিহাস,
ভবিতব্য লিখে দেবে করোটির খিদে।
ওরা দুটি মিলেমিশে স্থির হয়ে যাবে
হাওয়ার থেকেও দ্রুত, সময়ের আগে।
২.
খোলস
সকালবেলা ঘুম ভাঙলেই সাপ হয়ে যাই।
অরণ্যের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে জলপ্রপাত,
গুহার ভেতর মণি
আর ফুরফুরে হাওয়ায় প্রগতিশীল জল।
এভাবেই আজকাল আমরা বদলে ফেলি দেশ,
মিডিয়ায় লাইভ হয় আত্মরক্ষা…
খোলস একা পড়ে থাকে সোঁদাগন্ধ মাটিতে।
৩.
সাহস
ডোরাকাটা বাঘের সাথে যুদ্ধ করতে করতে
আমাদের সাহস সব খরস্রোতা হয়ে যাচ্ছে।
জল পেরিয়ে রোদ পড়ছে নখে,
ঠোঁটের কোনে লেগে থাকা
ডরমেন্ট ভলক্যানো জুড়ে –
ভোর লিখে দিচ্ছি ভৈরবে।
বাঘের ডোরা নিয়ে যাচ্ছে জেব্রা ক্রসিং-এর ভিড় ।
এবার তবে সাবধান হও বাঘ…
৪
বয়স
এভাবেই ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে পথ,
দৃশ্যতঃ আমরা তাকে গতি বলে জানি।
গাছেদের বন্ধু হয়ে
নিপাট জঙ্গল তুলে আনি।
সেখানে সবুজ যত রিক্ত ছেলেবেলা,
নদী হয়ে বয়ে যায় প্রশমিত সময়ের ঢেউ।
পাতা জুড়ে বাড়তে থাকা ফেরারি ডানায়
তোয়াক্কা না করা সেই কিশোরী আকাশ চেনে কেউ?
পথ, একটা পথ রোজ মনে করিয়ে দেয় আমাদের
বয়স নিতান্ত সেই ধ্রুবক সংখ্যাটি।
৫
আগন্তুক
রেল ঝমঝম মাথার ভেতর শ্রাবণ বেলার সুর
নাচছে আকাশ, মাতছে বাতাস, কাঁপছে সমুদ্দুর।
রেল ঝমঝম বুকের ভেতর দামাল সে এক রোদ
মেঘের দেখলেই চোখ রাঙিয়ে চুড়ান্ত শোধবোধ।
রেল ঝমঝম চোখের পাতায় হাড় কাঁপানো শীত
বারান্দাতে অল্প আলোয় বাসন্তী ইঙ্গিত।
রেল ঝমঝম কানের ভেতর কেবল প্রেমের গান
জোয়ার আসার অপেক্ষাতে আনন্দ টানটান।
রেল ঝমঝম ঠোঁটের ভেতর হারিয়ে যাবার সুখ
কোথায় আমার রেল ঝমঝম অচিন আগন্তুক।
৬.
মুখোশ
মুখোশ পরার জন্য একটা ছৌ-নাচই যথেষ্ট,
আর শেখার জন্য রঙ,
রঙের উপর চওড়া একটা বিনয় রাখতে হয়,
আর একটু সন্তোষ,
তুমি আগে একটা বিনয় পরে এসো, মুখোশ।
৭.
বাউল গাছ
ন্যাঁড়া গাছ সারাদিন একা
বিকেল বিষন্ন হলে কলতান পাতা হয়ে ওঠে ।
ওরা রোজ কাজ সারা হলে ফিরে আসে পাতার ভেতর
দুটি পথ মিলেমিশে ঘর হয়ে ওঠে।
ডালে ডালে দোতারার কিচিরমিচির
নিজেদের শব্দ খুঁজে রাখে,
গাছ বা বাউল ওরা দুজনেই জানে
প্রলম্বিত শূন্যতার নিজস্ব সমুদ্র রাখা থাকে।
৮
আততায়ী
এবার আমার ঘরে নামতে দাও রাজার উঠোন
কিছু ধান, গম ছুঁড়ে ডেকে নাও পাখির পালক,
মুকুটে পালক জুড়ে ওমনি আমি রাজা হয়ে যাব।
দেশ জুড়ে পালন হোক এই এক রাজাসাজা খেলা।
সবাই সবার রাজা , সবাই নিয়ম করে রোজ
অনিয়মে গা ভাসিয়ে আইনত এদিন বদলাব।
সেদিন পাখির আর আততায়ী পালক থাকবে না,
কালোকালো ডানা মেলে আমরাই আকাশ খুঁটে খাব ।
৯.
আত্মজীবনী
যে নদী পলিতে তার আত্মজীবনীর কথা লেখে।
নশ্বর শরীর জুড়ে রোদ্দুর বিছিয়ে রাখে মাটি।
বিকেলের শান্ত হাঁটাহাঁটি …
এ সময় শান্তি নেই অ্যানিমিক ফুটিফাটা ত্বকে।
বাউল বটের পাতা হতে পারেনি শীতলপাটি ।
নীলের ভিতরে নীল, তার গর্ভ জুড়ে থাকে আলো
আলোর জঠর থেকে উপচে ওঠে কবেকার ব্যথা।
বহমান কিছু নীরবতা …
তবুও জীবন জুড়ে আছে নীরা, বনলতা সেন,
উত্তরপুরুষই জানে নাব্যতার রঙিন রূপকথা।
১০.
পুজো
এইযে এত সাদাকালো , মুখোমুখি মুখ আর মুখোশ
কে কার প্রতীক হবে, কেইবা খবর হবে ভোরে?
কার চোখে কোন ভাষা লাল, নীল, সবল, অবশ
কে দেখবে স্বপ্ন আর কে মরবে স্বপ্ন লাল করে।
ওদিকে মিছিল ছোটে, এদিক স্লোগানে ঢেকে যায়।
আমি শুধু লিখে যাই আমারতো ছায়ার শরীর।
কে কত পেয়েছে ব্যথা, কে ক’বার মুখোশ পাল্টায়?
কেন রক্তে ভিজেছিল ? কি দোষ ছিল সে মেয়েটির?
মুখ থেকে মুখোশের ছায়াটুকু ছিঁড়ে নিতে চাই
যে রং পায়না ভয় আজ সেই রঙের দোহাই,
হাতে তো পারিনা তাই ইচ্ছেটুকু মুখেই শোনাই।।
