বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব- ২৬

সেই সন্দেহজনক মোবাইল নাম্বার ট্র্যাক করা হয়েছে। দেখা গেছে নাম্বারটা রেজিস্ট্রিকৃত নয়। তাই সেটা কার জানা যায় নি। তবে কোন্ জায়গা থেকে কল করা হয়েছিল তা চিহ্নিত করা গেছে। দু’বারই কল এসেছিল বছিলা থেকে। আজ ভোর রাতে পুলিশ বছিলা থেকে একজন দাগী সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করেছে। ঘটনাস্থালের নিকটবর্তী একটি গলি থেকেও একজনকে ধরা হয়েছে। থানার পুলিশ এ দুজনকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করবে।
সিআইডি’র এসএস (ক্রাইম) ইন্সপেক্টর জিলানীকে সতর্কতার সাথে চলাচল করার পরামর্শ দিয়েছেন। জিলানীর গাড়িতে অন্য একজন ড্রাইভার দেওয়া হয়েছে, নাম দীপক। দীপকও ড্রাইভার কায়েসের মতো অভিজ্ঞ ও সাহসী। কায়েস এখনও হাসপাতালে, তবে সুস্থ আছে।
রিমান্ডের আসামি খসরুর কাউন্সেলিং চলছে। তার আচরণে অস্বাভিকতা অনেকটাই কমেছে। জিলানী আশা করছে তার কাছ থেকে অনেক প্রশ্নের উত্তরই পাওয়া যাবে। সে জন্য তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের কৌশল পাল্টাতে হবে।
ইন্সপেক্টর জিলানী তাঁর অফিসরুমে। মনটা একটু বিষন্ন। মোবাইলটা তুলে ধামরাই থানার ওসি সাহেবকে কল দিলেন।
‘হ্যালো দোস্ত ! ছবি যেটা পাঠালে সেটা তো জেরিনের না। আশাটা মাটি হয়ে গেলো। আচ্ছা, যে মহিলাকে মৃত পাওয়া গিয়েছিল তার তথ্য কি সংগ্রহ করা যাবে ?’
‘অবশ্যই যাবে ! যতদূর মনে পড়ে সে তথ্যটাও ওরা দিয়েছিল। দোস্ত, আমি দেখে তোমাকে একটু পরে কল দিচ্ছি।’
নিধি আজ পিন্টুকে ডেকেছে। তাকে দিয়ে বাজার করিয়েছে। সালেকা বুয়াকে দিয়ে আনুষঙ্গিক কাজ করিয়ে দুপুরে নিধি নিজহাতে চিকেন বিরিয়ানি রান্না করেছে। রুস্তম, আদিল এবং মোচনকে ডেকে খাইয়েছে। বিরিয়ানির পর দইও ছিল। তাদের খাবার পরিবেশনে ছিল পিন্টু। খাওয়ার পর ওরা তিনজনই নিধির রান্নার প্রশংসা না করে পারে নি। ওরা চলে যাবার পর নিধি ও পিন্টু একসঙ্গে বসে খেয়েছে। যদিও তাদের ভেতরে আগের মতো ভাবও নেই, উচ্ছ্বাসও নেই। অন্যদিকে এ বাড়ির বাগানের পুষ্প ও পত্রপল্লব যেন ক্রমেই অধিক সতেজ ও সুশোভিত হয়ে উঠছে।
জিলানী হাসপাতালে কায়েসকে দেখে ফিরছেন। তাঁর বন্ধুর ফোন এলো।
‘দোস্ত, মৃত মহিলার ছবি সংগ্রহ করে পাঠিয়েছি তোমার মোবাইলে। মহিলার নাকি কেউ ছিল না। নাম ঠিকানা কিছুই জানা যায় নি। সে কারণে পুলিশই তাকে মানিকগঞ্জ কবরস্থানে দাফন করেছে। হোয়াটসআপ দেখো।’
‘অনেক ধন্যবাদ দোস্ত।’
জিলানী গাড়িতে। ভাবছেন, নিজের কেউ নেই বলে মৃতার লাশ সেখানেই দাফন করা হয়েছে। তাহলে কি সেটা জেরিনের লাশই ছিল? আহা বেচারি !
জিলানী তাঁর হোয়াটসআপ চোখ বুলালেন। লাশের মুখের ছবি। ভালো করে দেখলেন। কিছুটা ঝাপসা হলেও বোঝা যাচ্ছে। এটা জেরিনের ছবি নয়। যাক্ বাবা !
জিলানী অফিসে ফিরে এলেন। বুকটা কেমন যেন ভার হয়ে আছে। এক কাপ চা ও বিস্কুট খেলেন। এরপর তাঁর মোবাইলের গ্যালারিতে গিয়ে জেরিনের ছবি ক্লিক করে ফেসবুকে আপলোড করলেন। জেরিনের নাম, বর্ণনা, ঠিকানা ও তারিখসহ নিখোঁজ হওয়ার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা লিখলেন। শেষে নিজের নাম ঠিকানা ও মোবাইল নাম্বারও দিলেন। তারপর ‘পাবলিক’এ পোস্ট করলেন। জিলানীর বিশ্বাস, যদি জেরিন বেঁচে থাকে তাহলে অবশ্যই কোন না কোন জায়গা থেকে এ পোস্টের সাড়া পাওয়া যাবে।
এসময় সোহরাবের ফোন এলো। সোহরাবকে তিনি মগবাজার কাজী অফিসে পাঠিয়েছিলেন। জিলানী ফোন রিসিভ করলেন।
‘বলো সোহরাব।’
‘স্যার আমি এখন মগবাজার কাজী অফিসে।’
‘বুঝেছি। কিছু পেলে ?’
‘জি স্যার। স্যান্ডোর বক্তব্য সঠিক। রিফাত নিধিকে বিয়ে করেছে।’
‘কবে ?’
‘গত অক্টোবরে। প্রায় ছয় মাস আগে। নিধির পক্ষে সাক্ষী হয়েছে স্যান্ডো, আর রিফাতের পক্ষে এই কাজী অফিসের একজন।’
‘তুমি কাবিননামার একটা ফটো তুলে নিয়ে এসো। হার্ড ডিস্কে রাখতে হবে।’
‘ঠিক আছে স্যার।’
জিলানী ভাবছেন। দুজন যেহেতু গোপনে বিয়ে করেছে, নিশ্চয়ই তাদের ভেতরে কোনো চুক্তি হয়েছে কিংবা নির্দিষ্ট কোন পূর্বশর্ত রয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে দেখা যায় যে রেজাউদ্দিন সাহেবের সম্পত্তি ভাগাভাগি করে হাতিয়ে নেয়াটাই মূল শর্ত। রিফাত যেহেতু তৃতীয় তলার ওপর তার নামে জাল পাওয়ার অব এটর্নি করিয়েছে, সেভাবে নিধির নামেও ডুপ্লেক্স বাড়ি ও ভূমির ওপর জাল পাওয়ার অব এটর্নি তৈরি করা হয়েছে। এতে কোন সন্দেহ নেই, যতোই নিধি অস্বীকার করুক।
সাজিয়া পত্রিকার এবারের ঈদসংখ্যার এ পর্যন্ত চারটি ছোট গল্প এবং বারোটা কবিতা পড়ে ফেলেছে। তার পছন্দের লেখকের নাম দেখলেই তার সাথে সাথে পড়ে ফেলা চাই। কোনো কবিতা মনে ধরলে আবৃত্তি করতে থাকে। ফেসবুকেও মাঝে মাঝে আবৃত্তি পোস্ট করে, কখনও কখনও রাইট আপও দেয়। এখন আর লাইভ গান পোস্ট করে না। একবার পোস্ট করে বুঝেছে, মানুষ কীভাবে হামলে পড়ে আর কমেন্ট করে ! কমেন্টগুলোর বেশির ভাগই গানের চেয়ে তার সৌন্দর্যের উপর। তার মনে হয় যেন অসংখ্য মানুষের হাতে কোন কাজ নেই ফেসবুকে লেগে থাকা ছাড়া।
সাজিয়া দেখলো জিলানী আজ সন্ধ্যার পরই চলে এসেছে। খুশি হলো। জিলানীর সাথে নতুন দুজন ওয়াচারকে দেওয়া হয়েছে তাঁর প্রোটেকশনের জন্য। জিলানীর বস এসএস (ক্রাইম) সাহেব এ ব্যাবস্হাটা করেছেন। সাজিয়া ওয়াচার দুজনকে চা করে খাওয়ালো। জিলানীও খেলেন।
জিলানী দেখলেন ফেসবুকে তাঁর পোস্টের উপর ওয়ালে একটা নোটিফিকেশন এসেছে। তিনি ফেসবুকে ঢুকলেন। সত্যিই তো। জেরিনের ছবিসহ যে পোস্টটা দিয়েছিলেন তাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন প্রকৌশলী, নাম জাভেদ ইকবাল, এ মন্তব্যটি করেছেন :
১৩ জানুয়ারি খুব সকালে আমি ধলেশ্বরী নদীর পাড়ে বোল্ডার ফেলার কাজে ধলেশ্বরী ব্রীজের নিচে যাই। দেখি এক মহিলা অল্প পানিতে পড়ে আছে। চেহারাটা স্পষ্ট মনে নেই। হয়তোবা ইনিই হবেন। আমার লেবারদের দিয়ে তাকে তুলে দেখি তার পালস আছে, কিন্তু মহিলা অচেতন। তখন তাকে মানিকগঞ্জ সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাই। পরে তাকে ওয়ার্ডে নেওয়া হয়। এর পরদিনও আমি তাকে দেখতে গিয়েছিলাম। সেদিনও তাকে অজ্ঞান দেখি। সে কারণে তার নাম ঠিকানা জানা হয় নি। আমি আগামীকাল মানিকগঞ্জ যাবো। আপনি যদি সকাল ১০টায় ওই হাসপাতালে আসেন তাহলে দেখা হবে।
জিলানী যেন আশার আলো দেখতে পেলেন। তিনি জবাবে তাকে ধন্যবাদ দিলেন এবং আগামিকাল সকাল ১০ টায় হাজির থাকবেন বলে জানালেন।
জিলানী এখন জোশে আছেন। স্ত্রীকে বেশ জোর গলায় ডাক দিলেন, ‘ডার্লিং ! কোথায় তুমি ? খানা লাগাও। আজ একসাথে মজা করে ডিনার খাবো।’
চলবে….
