বিধ্বংসী প্রহর, পর্ব-৩

রাত গভীর। আচমকা নিধির ঘুম ভেঙে গেল। সে ঘুমিয়েছে তাও মাত্র এক ঘণ্টা হলো। ঘুম হয় না। এত বড় বাড়িতে একা একা ভয় করে। জেরিন ম্যাডামকে মনে পড়ে। বৃদ্ধ রেজাউদ্দিন সাহেবের মুখটা সামনে ভাসে। নিধির কাছে মনে হয় যেন এই বর্তমানটা তার সাথে বিট্রে করছে, আর ভবিষ্যতের মাঠে দেখতে পাচ্ছে ধাবমান ধূলিঝড়।
উঠে এক গ্লাস পানি খেয়ে নিল। বাগানে সদলবলে ডেকেই চলেছে ঝিঁঝিঁ পোকা। মাঝে মাঝে কুকুরের কান্নার আওয়াজ। ধানমন্ডির সড়কে থেকে থেকে গাড়ির শব্দ। এদিকে এই ঘরের ভেতরটাতে যেন ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ এর মতো পরিবেশ।
নিধি অগত্যা ড্রাইভার পিন্টুকে মোবাইলে কল দেয়। কিন্তু পিন্টুর মোবাইল সুইচড অফ। সময় দেখলো, রাত তিনটা। রুমের ‘ডিম লাইট’টা জ্বালালো। তারপর পেছনে দু’হাত দিয়ে ম্যাক্সির ভেতর থেকে ব্রা’র হুক খুলে ফেললো। এবার বুকটা একটু ফ্রি লাগছে। ইদানিং অনেক কিছুই সে ভুলে যায়। নিধি আবার বিছানায় শুয়ে পড়লো। বড়সড় কোলবালিশটা টেনে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে রাখল।
আজ বেলা বারোটার আগে ভাগেই তিনতলার ভাড়াটে রিফাত থানায় এসে হাজির। পিন্টু এলো দশ মিনিট পরে। এসআই রাজিব বাইরে ডিউটিতে থাকায় উভয়ে ওয়েটিং রুমে নিরিবিলি অপেক্ষমান। কেউ কারও সাথে কথা বলছে না। রিফাত তার আইফোনটা বের করে ফেসবুকে চোখ বুলালো। এই সকালেই নিধি তার বাসায় এসে রেজাউদ্দিন সাহেবের লেটেস্ট একটা ছবি তাকে দিয়ে নিখোঁজ সংবাদ পোস্ট করতে বলেছিল। সে যথারীতি কাজটা করেছে। যদি কেউ খোঁজ দেয় !
এসআই রাজিব থানায় এলেন। প্রথমে রিফাত ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁর রুমে ডাকলেন। রিফাত এসে সামনে বসলো। এসআই রাজিব বললেন—
‘আপনি কি রেজাউদ্দিন সাহেবের আত্মীয় হন ?’
‘দূর সম্পর্কের।’ রিফাতের উত্তর।
‘কী করেন ?’
‘একটা আইটি কোম্পানিতে আছি। সফ্টঅয়ার ইঞ্জিনিয়ার।’
‘ভালো। আপনার ফ্ল্যাট থেকে নিচের বাগানটা পরিষ্কার দেখা যায়, তাই না ?’
‘জী, দেখা যায়।’
‘সেদিন বিকেল পাঁচটায় আপনি কি অফিসে ছিলেন ?’
‘না বাসায়। সেদিন শুক্রবার ছিল।’
‘রেজাউদ্দিন সাহেব কি বাগানে নিজে নিজে হাঁটছিলেন নাকি ড্রাইভার ধরে ধরে হাঁটাচ্ছিলেন ?’
‘সেদিন বিকেলে রেজাউদ্দিন সাহেবকে বাগানে হাঁটতে কিংবা হাঁটাতে দেখি নি। তিনি ঘর থেকে বেরই হন নি।’
রিফাতের এমন কথা শুনে পুলিশ অফিসার কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইলেন। তারপর আবার কথা বললেন।
‘বলেন কী ! রেজাউদ্দিন সাহেব নিখোঁজ হন নি ?’
‘কী হয়েছেন সেটা আপনারা বের করুন। সেদিন বিকেলে তাঁকে আমি বের হতে দেখি নি।’
‘যদি বলি কারও প্রতি ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে, বা বিপদে ফেলার জন্য আপনি এ কথা বলছেন ?’
‘একদমই না। সত্যিটাই বললাম।’
‘নিধির সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন ?’
‘স্বাভাবিক।’
‘শুনেছি আপনার স্ত্রীর সঙ্গে আপনি সেপারেশনে আছেন ?’
‘সেটা আমাদের নিজেদের দাম্পত্য বিষয়।’
‘আপনি কি তিনতলার ফ্ল্যাটটা আপনার কাছে বিক্রি করবার জন্য রেজাউদ্দিন সাহেবকে বেশ কয়েকবার চাপ দিয়েছিলেন ?’
‘এটা সত্য নয়।’
‘আপনি এখন ওই বাড়ি দখলের প্ল্যান করছেন বলে শোনা যায়।’
‘কে বলেছে ?’
‘সেটা তো আপনাকে বলবো না।’
‘কথাটা সত্য নয়।’
‘ওকে। আজ এটুকুই। থ্যাংক ইউ।’
‘ইউ আর ওয়েলকাম।’
কিছুক্ষণ পর পিন্টু এসআই সাহেবের কক্ষে গেলো। সালাম জানালো। সালামের জবাব দিয়ে এসআই রাজিব বললেন, ‘বসেন। কতোদিন ধরে গাড়ি ড্রাইভ করছেন ?’
‘পাঁচ বছর।’
‘ওই বাড়িতে পাঁচ বছর ?’
‘আচ্ছা ওই বাড়িতে ? তা প্রায় দুই বছর।’
‘কার ডিউটি করেন ?’
‘জেরিন ম্যাডামের ডিউটি করতাম। ওনার বাবা তো অনেকদিন যাবত অসুস্থ।’
‘নিধিকে নিয়ে গাড়ি চালান নি ?’
‘অ্যাঁ.. জরুরি কাজ বা মার্কেটিং হলে নিধি রোজিনা ম্যাডাম থেকে গাড়ি চেয়ে নিতেন, যদি গাড়ি ফ্রি থাকতো।’
কিছুক্ষণ কক্ষে নিশ্চুপ নিরবতা।
‘আপনি নিধিকে ভালোবাসেন ?’ এসআই জিজ্ঞেস করলেন।
হঠাৎ এ প্রশ্নে পিন্টু থতোমতো খেয়ে গেল। কিন্তু জবাব তো দিতে হবে। পুলিশ হয়তো সব খবর টবর নিয়েই জিজ্ঞেস করছে।
‘জী। মিথ্যা বলবো না।’
‘নিধিও ?’
‘জী স্যার।’
‘দুজনে বিয়ে করবেন ?’
পিন্টু ইতস্তত করতে লাগল। এসব প্রশ্নের মুখামুখি হবে সে ভাবে নি।
‘কী, বলুন !’
‘আল্লাহর হুকুম থাকলে বিয়ে করব।’
‘উনি ডিভোর্সি এটা বোধ হয় জানেন না !’
‘জী এটাও জানি।’
‘দুজন কোন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করে রেখেছেন ?’
‘না।’
‘যদি বলি রেজাউদ্দিন সাহেবের গুম অথবা খুন হওয়ার পেছনে আপনার হাত আছে ?’
‘খুন’ শব্দটা শুনেই সে চিৎকার দিয়ে উঠলো— কী বলেন— খুন !!
পিন্টু মাথাটা কাত করে চেয়ারেই অজ্ঞান হয়ে গেলো।
পশ্চিম ধানমন্ডির শঙ্করে অবস্হিত ছোট একটি ভাড়া বাড়ি। পিন্টুর মা দুপুরের রান্না কেবলই শেষ করেছেন। ঘরের সামনে পুলিশের গাড়ি থামতে দেখে হকচকিয়ে গেলেন। গাড়ি থেকে নামলেন এসআই রাজিব। তার সঙ্গে সঙ্গে নেমে খুব ধীরগতিতে হেঁটে ঘরে উঠল পিন্টু। মা এগিয়ে গেলেন। বললেন, ‘কী হইছে পিন্টু ? তোকে এইরকম লাগতেছে কেন? পুলিশই বা কেন ?’
পুলিশ অফিসার বললেন, ‘ঘাবরাবেন না। একটু মাথাটা ঘুরেছিল তার। রেস্ট নিলে ঠিক হয়ে যাবে।’
পিন্টুকে তার বিছানায় শুইয়ে দেওয়া হলো। পিন্টুর ছোট বোন এসে সিলিং ফ্যান ছেড়ে দিলো। এসআই সাহেব ঘরের ভেতর একটা চক্কর দিয়ে একনজরে ডাইনিংসহ সবগুলো রুম দেখে নিলেন। বসার কক্ষে গিয়ে পিন্টুর মাকে বললেন, ‘একটু কথা আছে আপনার সাথে।’
পিন্টুর মার মুখে ভীতিকর উৎকন্ঠা ! বেচারি এমনিতেই হার্টের রুগী, হাই প্রেসার। আল্লাহ জানে তার ছেলে কী কান্ড করেছে ! বসার কক্ষেও একটা সিংগেল ঘাট রাখা আছে। তিনি খাটের উপরই বসলেন। পুলিশ অফিসার বললেন, ‘আপনার ছেলে-মেয়ে ক’জন ?’
পিন্টুর মা বললেন, ‘দুই মেয়ে এক ছেলে। বড় মেয়ে বন্যার বিয়া হইছে। তারপর ছেলে পিন্টু। সবার ছোট ওই মেয়ে স্বর্ণা, কলেজে পড়ে।’
‘আপনার ছেলে তো বিয়ে করে নি ?’
‘না।’
‘তার কোন পছন্দ আছে ?’
‘সে আমাকে বলছিল যে একটা মেয়েকে পছন্দ করে।’
‘কোন মেয়ে ?’
‘ওই, যে বাড়ির গাড়ি চালায় সেই বাড়ির।’
‘মালিকের মেয়ে ?’
‘না। মালিক তো অসুস্থ। তার মেয়ে হইলো পিন্টুর বস। মালিককে দেখাশুনা করে, সেবা করে আরেকটা মেয়ে। একজন নার্স। সে। আর সেই মেয়েও পিন্টুকে পছন্দ করে।’
‘মালিক যে গুম হয়ে গেছে এটা শুনেছেন ?’
পিন্টুর মা শুনে আশ্চর্য হলেন। বললেন, ‘হায় আল্লাহ ! কেমনে ? এইজন্যই তিনদিন যাবত পিন্টুকে দেখি খালি চিন্তা করে ! খায় না, দায় না !’
সরল মা গড় গড় করে পুলিশকে সব বলে দিচ্ছে দেখে মেয়ে স্বর্ণা পাশের রুম থেকে দাঁত কিড়মিড় করছে।
এসআই রাজিব বললেন, ‘এই সংসার কি আপনার ছেলের আয়ে চলে, নাকি আরও আয় আছে ?’
‘হ্যাঁ। ওদের বাবা ব্যাংকের কর্মচারী ছিল। পাঁচ বছর আগে মারা যাওয়ার পর ওনার পেনশনের টাকা দিয়া দুই বৎসর চলছিল। তার পর তো পিন্টুই চালাইতেছে এই সংসার। সেদিন বলল, শিগগিরই আমাদের সুদিন আসবে।’
‘আচ্ছা। এটা বলেছে। আর কিছু ?’
স্বর্ণা ঠান্ডা এক গ্লাস কোক নিয়ে বসার কক্ষে ঢুকল। মাকে বলল, ‘মা, যার বিষয় তাকে বলতে দেওয়া ভালো না ?’
‘সে তো ঘুমাইতেছে।’ মা বললেন।
এই ফাঁকে এসআই রাজিব স্বর্ণার দিকে তাকালেন। দেখতে গোলগাল, সুন্দর। অনেকটা টিভি অ্যাক্ট্রেস রিচির মতো। দুজনের চোখাচোখি হলো। স্বর্ণা বললো, ‘একটু ঠান্ডা ড্রিংক্স নিন।’
‘আমি কোল্ড ড্রিংক্স খাই না।’
‘তাহলে চা করে দেবো ?’
‘না। থ্যাংকস্। আপনি কোন্ ইয়ারে পড়েন ?’
‘সেকেন্ড ইয়ারে।’
‘আচ্ছা, এখন উঠি। প্রয়োজনে আবার আসা হতে পারে।’
পুলিশের জীপ শঙ্করে অবস্হিত পিন্টুদের বাসার আঙ্গিনা ত্যাগ করলো। পাড়া প্রতিবেশীরা, বিশেষ করে মহিলারা, ইতিউতি করছিল। তাদের ঔৎসুক্যের শেষ নেই।
[চলবে…].
