অনালোচিত ইতিহাস উদার আকাশ বিশেষ সংখ্যা

ফারুক আহমেদ সম্পাদিত ‘উদার আকাশ’ পত্রিকার ঈদ-শারদ উৎসব সংখ্যা ১৪৩৩ প্রসঙ্গে সাহিত্য-সংস্কৃতির লিটল ম্যাগাজিন মানেই শুধু কবিতা আর গল্প নয়। ক্ষুদ্র হয়েও এমন কাজ‌ তারা করে বসে যা বড়দের খামতিটুকু ঢেকে দেয় প্রবল পরাক্রমে। ভাঙড়ের ঘটকপুকুর থেকে প্রকাশিত ‘উদার আকাশ’-এর ২৫ বর্ষের ঈদ-শারদ উৎসব সংখ্যা ১৪৩৩ তেমনই একটি আয়োজন।

এবারের বিশেষ সংখ্যা— “ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের অবদান”। বিষয়টি নতুন নয়, কিন্তু আলোচনার তো শেষ নেই! কারণ স্বাধীনতার ৭৯ বছর পেরিয়েও এই প্রসঙ্গ আমাদের পাঠ্যপুস্তক ও জনস্মৃতিতে আরও জায়গা পাওয়ার প্রত্যাশী ছিল।

এই প্রসঙ্গে সম্পাদক ফারুক আহমেদ বললেন, “এটা কেবল একটি পুজো বা ইদ সংখ্যা নয়। আমরা চেয়েছি স্বাধীনতার যে ইতিহাসটা আড়ালে থেকে গেছে তাকে সামনে আনতে।” এই উচ্চারণটুকুই গোটা সংখ্যার দিকনির্দেশ ঠিক করে দেয়।

বিষয়বস্তু ও লেখক :
‘ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের অবদান’ বিভাগে লিখেছেন খাজিম আহমেদ, রোকেয়া ইসলাম, সোনিয়া তাসনিম, তৈমুর খান, কেতকী মির্জা, শিবনাথ দাস প্রমুখ কবি-লেখকগণ যথাসাধ্য আলোচনা করেছেন। একক বীরত্বের গল্প নয়, বরং আন্দোলনের সামগ্রিকতায় মুসলিম সমাজের অংশগ্রহণ আমাদের উজ্জীবিত করেছে। কৃষক বিদ্রোহ থেকে আইন অমান্য, জেল থেকে নির্বাসন—সেই নানাস্তরের ঘটনাবলিকে যথাসম্ভব ধরার চেষ্টা করেছেন।

শুধু ইতিহাস নয়। পাশাপাশি আছে মইনুল হাসানের ‘রাজনীতি’, দেবাশিস পাঠকের ‘রাজধর্ম’, গৌতম পালের ‘অর্থনীতি’ আমাদের সমৃদ্ধ করেছে। সাহিত্য চর্চায় জায়গা পেয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, শ্যামাপ্রসাদ মুখেপাধ্যায়, এ কে ফজলুল হক ও আল মাহমুদ। জয়ন্ত ঘোষাল, দীপঙ্কর দত্ত, দীপক সাহা, মোহাম্মদ শামসুল আলমের প্রবন্ধগুলি এই সংখ্যাকে শুধু স্মারকগ্রন্থের গণ্ডি থেকে বের করে এনেছে তাই নয় দিয়েছে ইতিহাস-সাহিত্য- সমাজবিজ্ঞানের স্বাদ‌ও।

যথারীতি অন্যান্য সংখ্যার মতো এই সংখ্যাতেও কবিতা বিভাগ বেশ বড় বড়। সালেহা খাতুন থেকে আমিনুল ইসলাম— ১৮ জনের লেখা। সঙ্গে ‘শিক্ষা অধিকার’, ‘সহিষ্ণুতা’, ‘ফেলে আসা দিন’-এর মতো বিভাগ স্থানীয় প্রেক্ষাপটকেও ছুঁয়ে যায়।

উপস্থাপনা :
অসাধারণ প্রচ্ছদ করেছেন মৌসুমী বিশ্বাস। তার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। অলংকরণে প্রতিশ্রুতিমান শিল্পী রাইসা নুর। বাবাসাহেব আম্বেদকর এডুকেশন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক অরুণাশিস গোস্বামী সংখ্যাটি উদ্বোধন করেছেন— এটাও একটা তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। কারণ সংবিধান ও সাম্যের কথা যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনে উচ্চারিত হয়, সেখান থেকেই এই ‘অনালোচিত ইতিহাস’-এর স্বীকৃতির শুরু।

প্রাসঙ্গিকতা:
আজ যখন ইতিহাসকে বারবার একমুখী করে দেখার চেষ্টা হয়, তখন ‘উদার আকাশ’-এর এই সংখ্যা মনে করিয়ে দেয় স্বাধীনতা কোনও এক সম্প্রদায়ের একার অর্জন ছিল না। ১০০০ টাকার এই সংখ্যাটি তাই শুধু পত্রিকা নয়, এক ধরনের নথি। এবং আমাদের অনুমান এটি একটি অবশ্যই সংগ্রহযোগ্য দলিল।

ছোট পরিসরের সীমাবদ্ধতা আছে। আরও তথ্যচিত্র, দুর্লভ নথি থাকলে দলিলের ভার আরও বাড়ত। তবু উদ্যোগের সাহসকে ছোট করা যায় না। আমরা সম্পাদক এবং তার সহযোগী সদস্যদের অকুণ্ঠ সাধুবাদ জানাই।

ভাঙড়ের এক কোণ থেকে যে আলো জ্বেলেছে ফারুক ও তাঁর সহযোগীরা একবাক্যে আমরা স্বীকার করি তার নাম ‘উদার আকাশ’। এইখানেই তো নামের সার্থকতা।

বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য, ভারত

আরও পড়ুন