বই মানুষকে চিন্তা করতে শেখায়, উদ্বুদ্ধ করে

পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদের নাম হলো বই, যার সঙ্গে পার্থিব কোনো সম্পদের তুলনা হতে পারে না। একদিন হয়তো পার্থিব সব সম্পদ বিনষ্ট হয়ে যাবে, কিন্তু একটি ভালো বই থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান কখনো নিঃশেষ হবে না। তা চিরকাল হৃদয়ে জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখবে। আমাদের মধ্যে হয়তো অনেকেরই জানা আছে, আজ যাঁরা সফলতার চরম শীর্ষে পৌঁছেছেন, তাঁরা সবাই কতটা বই পড়তে আগ্রহী। জীবনে চরম সফল হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা বই পড়া থেকে নিজেদের বঞ্চিত রাখেন না। বই পড়ার মধ্য দিয়ে তাঁরা রোজ নিজেকে সমৃদ্ধ করে তোলেন। ওয়ারেন বাফেট তাঁর পেশাজীবনের শুরুতেই প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৭০০ পৃষ্ঠা নিয়মিত পড়তেন। তিনি বলেন, ‘Read 500 pages like this everyday. That’s how knowledge works. It builds up, like compound interest. All of you can do it, but I guarantee not many of you will.’
মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্যসাধনার মৌন সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের অজস্র বই। বইকে নিজের হৃদয়ের বন্ধু বানাতে পারলে মনের অনেক অভাব ঘুচে যায়। স্বশিক্ষা অর্জনে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের উচিত বই পড়া। বই পড়ার মাধ্যমে মানবমন বিকশিত হয়, পাশাপাশি মানুষ নিজেকে অন্যভাবে মেলে ধরতে পারে। আধুনিক জগতে সমগ্র বিশ্বকে উপলব্ধি করতে হলে সভ্য মানুষের বইয়ের অবারিত সঙ্গ না হলে চলে না। আবার বইয়ের সূত্রের মানুষ অগ্রসর হয়ে চলে সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিবর্তনের পথে। পৃথিবীর ইতিহাস-ঐতিহ্যের অন্যতম অবলম্বন বই। আমাদের মননশক্তি ও হৃদয়বৃত্তিকে সম্পূর্ণভাবে জাগ্রত করতে পারি বই পড়ার মাধ্যমেই। মস্তিষ্ককে শান্ দেওয়া, বিভিন্ন জিনিস জানা, সেই অনুপাতে চিন্তা করার ক্ষমতা অর্জন করা। ভালো বই কেবল তথ্য দেয় না ও প্রশ্নের উত্তর দেয় না; প্রশ্ন দেয়, চিন্তা করতে শেখায় বা উদ্বুদ্ধ করে। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষাই পৃথিবীকে পরিবর্তিত করতে পারে। আর শিক্ষা আসে বই, কলম ও শিক্ষক থেকে। শিক্ষা আসে পড়াশোনা থেকে। পড়াশোনা হয় বই থেকে। বইয়ের কোনো অভাব নেই। তাই শেখারও কোনো শেষ নেই। সব বই থেকেই কিছু না কিছু শেখা যায়। সব ধরনের বই-ই পড়তে পারো; শুধু নেতিবাচক শক্তিতে ভরপুর বইগুলো বাদ দিয়ে। ২০০৯ সালে যুক্তরাজ্যের সাসেক্স ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা হার্ট রেট ও মাসেল টেনশন মনিটরিংয়ের মাধ্যমে পরীক্ষা করে দেখেন, কিছু কিছু কাজ আমাদের মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। তাঁরা লক্ষ করেন, মাত্র ৬ মিনিটের জন্য বই পড়লে স্ট্রেস লেভেল ৬৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়, যা হাঁটা (৪২%), কফি পান (৫৪%) বা গান শোনার (৬১%) থেকে অনেকটা বেশি কার্যকর। বই পড়ার মধ্যে পুরোপুরি ডুবে যাওয়ার ফলে যে বিষয়গুলো আমাদের অমনোযোগী করে বা স্ট্রেস লেভেল বাড়িয়ে দেয়, তা অনেকটাই কমে যায়। কারণ, বই পড়ার মধ্য দিয়ে আমরা একমুহূর্তে কোনো এক অজানা জগতে পৌঁছাতে পারি। ২০১৩ সালে বেশ কিছু মানুষের ওপর গবেষণা করা হয়েছিল। যাঁরা এ গবেষণায় অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাঁরা টানা ৬ দিন ধরে বেশ রহস্যে ভরপুর গল্পের বই পড়ে যাচ্ছিলেন। তাঁদের ওপর এমআরআই স্ক্যান করে দেখা গিয়েছে, যতই গল্প রহস্যের দিকে এগোচ্ছে, ততই তাঁদের মস্তিষ্কের কোষগুলো উদ্দীপনাতে ভরপুর হয়ে উঠছে। বই পড়লে ডিমেনশিয়া ও আলঝেইমার নামের রোগ অনেক দূরে থাকে। ডিমেনশিয়া হলো স্মৃতিভ্রংশ, উন্মাদ। আলঝেইমার হলো বার্ধক্যজনিত একধরনের স্নায়বিক
মননশক্তি ও হৃদয়বৃত্তিকে সম্পূর্ণভাবে জাগ্রত করতে পারে বই। মডেল। মিশু। অবক্ষয়মূলক রোগ। প্রযুক্তির এ যুগে বই পড়ার অভ্যাসটা আমাদের প্রায় হারিয়ে গিয়েছে। সারা দিন সোশ্যাল মিডিয়ায় অবাধ বিচরণ আমাদের বই পড়া থেকে নিয়ে গেছে অনেক দূরে। আমরা এখন স্রোতের বিপরীতে অবস্থান করছি। বর্তমান প্রজন্ম বই পড়া থেকে বড্ড উদাসীন। বইমেলা ছাড়া আমাদের দেশে বই পড়া নিয়ে আলোচনা ও গুরুত্বের কথা খুব কমই বলা হয়। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের উচিত বই পড়ার গুরুত্ব নিয়ে বিভিন্ন সেমিনার ও ক্যাম্পেইন করে বিস্তর আলোচনা করা এবং মানুষকে বই পড়তে উদ্বুদ্ধ করা। পাশাপাশি আমাদের অভিভাবকদেরও উচিত সন্তানদের পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি বই পড়ার অভ্যাস গঠনে সাহায্য করা। তাই বলে বর্তমান প্রযুক্তিকে তো আর বাদ দেওয়া যাবে না। প্রযুক্তিকে যেমন বাদ দেওয়া যাবে না, তেমনি বই পড়ার অভ্যাসটা ত্যাগ করা যাবে না। বই অজ্ঞতার প্রাচীর ডিঙিয়ে জ্ঞানের আলোয় আপনাকে করবে আলোকিত। আত্মা করবে পরিশুদ্ধি। তাই বেশি করে বই পড়ুন।
ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্তী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক, প্রাইভেট হসপিটালস সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা
