‘শিশু কিশোর সাহিত্য: আমাদের প্রত্যাশা’ বিষয়ক আলোচনা নিয়ে এবারের ধানমন্ডি আড্ডা

২৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ধানমন্ডি মাসিক আড্ডা নবম আসর। এবারের আড্ডার বিষয় ছিল শিশু কিশোর সাহিত্য: আমাদের প্রত্যাশা। আড্ডা তখনোও শুরু হয়নি। এরমধ্যে চলে আসে অনেকেই। আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রার আগে আরেক আড্ডা জমে ওঠে। মুক্ত টেবিল আড্ডা; সাহিত্যেরই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চলতে থাকে তুমুল উচ্ছ্বাস ও সান্ধ্য চা-চক্র।

উপস্থিত ছিলেন সত্তর দশকের অন্যতম কবি নাসির আহমেদ, কবি আব্দুর রাজ্জাক, কথাসাহিত্যিক দিলারা মেসবাহ, কবি ও কথাশিল্পী রোকেয়া ইসলাম, কবি তপন বাগচী, কবি মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক, কবি ও প্রকাশক আবু সাঈদ, কবি মাহফুজ হিলালী, কবি রেবা হাবিবা, লেখক আশফাকুজ্জামান, কবি তাহমিনা শিল্পী, কবি নিগার সুলতানা, কবি কবিতা কস্তা, কবি জুয়েনা ইয়াসমীনসহ প্রমুখ।

আড্ডায় আলোচকরা। ছবি: সংগৃহীত

আলোচনাপর্ব শুরু হয় সন্ধ্যা সাতটায়। তার আগে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি পর্বে উপস্থিত সবাই নিজেদের পরিচয় তুলে ধরেন। এক সময় সঞ্চালক নূর কামরুন নাহার মাইক তুলে দেন কথাসাহিত্যিক মোহিত কামালের হাতে। তিনি একে একে আলোচকদের পরিচয় দিয়ে মঞ্চে ডেকে নেন। আসরের সভাপ্রধান করা হয় শিশুসাহিত্যিক সুজন বড়ুয়াকে।

আলোচক ছিলেন শিশুসাহিত্যিক ফারুক হোসেন, দন্ত্যস রওশন, জগলুল হায়দার, মাহবুবা ফারুক, মঈন মুরসালীন ও কাদের বাবু। প্রত্যেকেই শিশুসাহিত্যের জগতে উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব।

আলোচনা চলতে থাকে ফাঁকে ফাঁকে চলে ছড়া আবৃত্তি। উপস্থিত গুণীজনেরা অংশ নেন আলোচনায়। কবিতা ও আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে গান গেয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রাখেন অঙ্কোলজিস্ট ও শিল্পী গুলজার হোসেন উজ্জ্বল।

শিশুসাহিত্য নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা, সংকট ও উত্তরণের নানাবিষয়ের গঠনমূলক আলোচনা চলে।

ধানমান্ড আড্ডার সভাপতি কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল শুভেচ্ছা বক্তব্য দিচ্ছেন। ছবি: সংগৃহীত

দন্ত্যস রওশন বলেন শিশুসাহিত্যের বইগুলোতে বয়সের উল্লেখ প্রয়োজন। তাহলে বোঝা যায় বইটি কোন বয়সের উপযোগী। শিশুসাহিত্য জটিল বিষয়।

মঈন মুরসালিন বলেন-যুগের পরিবর্তন হয়েছে, শিশুদের ভাষা বদলে গেছে। প্রযুক্তি এসেছে। এআই এসেছে। আমাদের শিশুদের বদলে যাওয়া ভাষাটা বুঝতে হবে। সেভাবে আমাদের লিখতে হবে তবেই শিশুরা বই পড়বে। তবে আমরা পশ্চিমবঙ্গ থেকে শিশুসাহিত্যে এগিয়ে আছি।

জগলুল হায়দার বলেন, ‘শিশুরা সরল তাই শিশুসাহিত্যও জটিল নয়। আর ভাষা হবে প্রকৃতির মতো সহজ। প্রকৃতিই ভাষা শিক্ষা দেবে। শিশু নিজেই প্রকৃতি থেকে ভাষা শিখে নেবে। তাই আরও বেশি করে প্রকৃতির কাছে যেতে হবে। আর বইয়ে বয়স থাকারও প্রয়োজন নেই। শিশু সব পড়বে।’

ফারুক হোসেন বলেন, ‘অর্থহীন ছড়া একসময় শিশু পড়েছে। কিন্তু এখন আর সে সময় নেই। এখন শিশুরা অর্থবোধক ছড়া পড়ে। ছড়ার মধ্য দিয়ে সমাজ এবং সমাজের বৈষম্যও জানে। তাই অনেক বদলে গেছে শিশু-কিশোর সাহিত্য। আলোচনায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় শিশু-সাহিত্যের জন্য যে কিছু করা প্রয়োজন তা বলা হচ্ছে। সত্যিকার অর্থে সেটি নেই। সেটির প্রয়োজন। তবু শিশু সাহিত্যিকরা লিখছেন, বাচ্চারাও পড়ছে । নানা প্রতিবন্ধতার মধ্য দিয়েই একদিন হয়তো এ শাখা আরো সমৃদ্ধি অর্জন করবে।

আড্ডা শেষে অতিথিদের সঙ্গে আড্ডারুরা। ছবি : সংগৃহীত

মাহবুবা ফারুক বলেন, ‘শিশুদের নিয়েই আমার কাজ। তাদের হাতে আমরা মোবাইল দিতে নিষেধ করি। আবার তাদের পড়াশোনা এখন মোবাইলে। তাহলে শিশুরা কি করবে? একজন শিশুকে গড়তে বাবা-মাকেও আরো সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে মাকে। মা ঘুম পাড়ানি গল্প আর ছড়া বলত। কিন্তু এখন হাতে দিচ্ছে মোবাইল। এগুলোও ভাবতে হবে।

কাদের বাবু বলেন, আগে শিশুদের বই প্রচুর প্রকাশ করা যেত। বিক্রিও হত। কিন্তু সেটি এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে। শিশুদের বই বিক্রি হতো বলে সবাই লিখতে চাইত, এটিও ঠিক নয়। সবাই শিশুদের জন্য লিখতে পারে না। শিশুদের উপযোগী লেখা খুব প্রয়োজন।

দিলারা মেসবাহ বলেন, ‘কালজয়ী শিশুসাহিত্যগুলো এখনও আমাদের মনের খোরাক। তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিশুসাহিত্যিকের নাম ও তাদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে বলেন। শিশুদের সাহিত্যের ভাষাটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ এবং তা শিশুদের জন্যই হতে হবে।’

আড্ডা শেষে অতিথিদের সঙ্গে আড্ডারুরা। ছবি : সংগৃহীত

সুজন বড়ুয়া বলেন, ‘উপস্থিত আলোচকরা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে এনেছেন। সত্যি বেশ কিছু ভালো কথা এসেছে। শিশু সাহিত্য ভালো হতেই হবে। এজন্য সরকারের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। ভালো লেখার প্রয়োজন। শিশুদের মনস্তত্ত্ব বোঝা প্রয়োজন, তবে আমি আশাবাদী। আমাদের শিশুসাহিত্য এগিয়ে যাচ্ছে। অব্শ্যই এটি আরো ভালো হবে। শিশুরাও আরো সমৃদ্ধ হবে।

মগ্ন নামের এক কিশোরীও সভায় সাহিত্য নিয়ে তার মতামত জানান। কেমন বই তারা চায়, এ বিষয়ে তার মতামত খোলামেলাভাবে ব্যক্ত করে।

সবশেষে আবারও গান, ছড়ার ছন্দ আর সুরের রেশ নিয়ে শ্রোতারা বাড়ি ফিরে যান। জমজমাট এই আড্ডায় যেন নিজেকে ঋদ্ধ মনে হতে লাগে। ভেতর হতে জেগে ওঠে সাহিত্যে মগ্নতা।

আরও পড়ুন