শাশ্বতী ভট্টাচার্য একগুচ্ছ কবিতা
অচেনা
ক্রমশঃ মলিন হচ্ছে চেতনার সেই গলিপথ
যে পথে হেঁটেছে প্রেম, মানবিক স্বাধীন শপথ
যে পথে পুজোর আগে টুপটাপ শিউলি দিন গোনে,
সেই পথ মিশে যাচ্ছে মানুষের অন্ধকার মনে।
ফিকে হচ্ছে হাসিকান্না, ফিকে হচ্ছে মুহূর্তের দেখা
ভুলে যাচ্ছ নীতিকথা, সময়কে ফাঁকি দিয়ে একা
ছুটে যাচ্ছ আলো পেতে, রাত বুঝি ধরতে পারবে না
অন্ধকার চিনে নিচ্ছে যারা খুব কাছের অচেনা।
পর্দা
এইযে বড় হতে হতে ছোট হওয়া
বা একটা ছোটবেলাকে টেনেটুনে বড় করা,
এর নাম প্রত্যয়।
ছোটবেলা নামক গুহাটায়
আমরা গুটিসুটি মেরে বসে থাকি,
আজীবন…।
আর বেড়ে ওঠাটা একটা আড়াল।
একটা পর্দার মতো মিথ্যে।
আসলে আমরা কেউ বড় হতেই পারিনি।
ইন্টারভাল
এক একটা রাত যেন এক একটা ফ্ল্যাশব্যাক।
গদ্যের মতো সাজানো, স্বপ্নের মতো নয়।
মোট বইতে বইতে ক্লান্ত হয় পিঠ,
হাল চষতে চষতে রক্ত ভেজা পা।
নিটোল চাঁদের দৃশ্যে ঘরে ফেরার তাড়া,
জঙ্গল পেরিয়ে গেলে পথ,
সংরক্ষিত ভয় আর
অপেক্ষাকৃত মৃদুমন্দ খিদে।
বিছানার স্পটলাইটে ইঁটের মতো চোখ
স্বপ্নের মতো পোড়ানো তার নজর…
ছোট হতে হতে আলো তখন একটা বিন্দু,
যেন একটা ক্লাইমেক্স, লক্ষের মতো স্থির।
তারপর গাছে গাছে আলো জ্বলে ওঠে,
ইন্টারভালের ঘন্টায় মিশে যায়
টানাপোড়েনের আটপৌরে হিসেব,
অথবা সিম্ফনিক ট্রেলার…।
এক একটা রাত যেন এক একটা ফ্ল্যাশব্যাক
গল্পের মতো সাজানো, স্বপ্নের মতো নয়।
প্রতিটি ইন্টারভালের পর আমি ঘুমোতে যাই রোজ।
বয়স
এভাবেই ধীরে ধীরে পথ বড় হয়,
দৃশ্যতঃ আমরা তাকে গতি বলে জানি।
গাছেদের বন্ধু হতে গিয়ে
নিপাট জঙ্গল হয়ে উঠি।
সেখানে সবুজ যত রিক্ত ছেলেবেলা,
নদী হয়ে বয়ে যায় রোজ অবাধ্য ইচ্ছের ঢেউ।
পাতা জুড়ে বাড়তে থাকা ফেরারি ডানায়
তোয়াক্কা না করা সেই কিশোরী আকাশ।
পথ, একটা পথ রোজ মনে করিয়ে দেয় আমাদের
বয়স নিতান্ত সেই ধ্রুবক সংখ্যাটি ।
বিছানা
একটা খাট ক্রমশঃ একটা ঘর হয়ে উঠছে,
মশারীর মতো যার দেওয়াল।
বিছানাকে অভ্যাস বানিয়ে
বদলে নিচ্ছি আমার গলি থেকে রাজপথ,
রান্নাঘর থেকে ঠাকুরঘর,
আর একা হবার তাগিদ।
অন্ধকার গর্ভবতী হলে
পৃথিবী ক্রমশঃ ছোট হতে থাকে।
আর বিছানা, অবাঞ্ছিত আঁতুড়ঘর।
