আমাদের সবার শ্রদ্ধেয় সুলতান স্যারের কথা কেউ কী মনে রেখেছি…
স্কুল ছুটির পর পরেই বাসায় ছুটে আসতেন শিক্ষক সুলতান আলী। কোনো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা না করলেও তিনি ছিলেন আমাদের একজন প্রিয় শিক্ষক। বাসায় বাসায় গিয়ে তিনি পড়াতেন। এটা ছিল তাঁর অসীম আনন্দের। দীর্ঘ ৩০-৩৫ বছর কয়েক হাজার ছেলে মেয়েকে তিনি শিক্ষাদান করেছেন। তাঁর শিক্ষার্থীরা এখন সমাজে বড় বড় দায়িত্বে পালন করলেও তিনি আছে অনেক কষ্টে। বড় একা। তাঁর খোঁজও কেউ আর রাখে না। নিদারুণ অর্থকষ্ট আর অনাহারে দিন কাটেন তিনি। আমাদের সুলতানা স্যার, তিনি থাকেন ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়া ঘনিমহেষপুর গ্রামে।
জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধী তিনি। বাম পায়ের ভাঁজ সোজা করতে পারেন না। বর্তমানে শরীরে বাসা বেঁধেছে সংক্রমণ, চোখে দেখেন না কিছু। আর পড়াতে পারেন না তিনি। ধীরে ধীরে যোগাযোগ হারিয়েছে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে।
উচ্চমেধা সম্পন্ন সম্ভ্রান্ত পরিবারের একমাত্র সন্তান সুলতান আলীর সম্বল বলতে পড়নের কাপড় আর একটি ভাঙা দোচালা ঘর। অন্যের দয়া দাক্ষিণ্যের উপর চলেন তিনি। ভাগ্যক্রমে মাসে এক-দুইদিন জোটে মাছ বা মাংস-ভাত। যাঁদের তিনি পড়িয়েছেন তাঁর এখন কেউ কেউ শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু দুঃখের বিষয়, কেউ এই শিক্ষকের আর খবরও নেয় না। তিনি বলেন, হয়ত পড়াশোনা শিখিয়েছি, মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে পারিনি, তাই তাঁদের আচরণ নিয়ে আর আক্ষেপ করার কিছু নেই।
সুলতান আলীর বাবা ইয়াকুব আলী ছিলেন একজন দরজি। ১৯৭৭ সালে এসএসসি পরীক্ষায় ৭২ শতাংশ নম্বর পেয়ে রুহিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের মধ্যে তৎকালীন সময়ে রেকর্ড করেন। বাড়িতেই শুরু করেন গৃহ শিক্ষকতা। গণিতে তাঁর নিগুঢ় জ্ঞান ক্রমেই খ্যাতি এনে দেয়। উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সুলতান আলীর আদি বাড়ি ভারতের আসাম রাজ্যে। বাবার ব্যবসা সূত্রে প্রথমে ঢাকা আসা। পরবর্তীতে ঠাকুরগাঁও সদরের রুহিয়ায় এসে থেকে যান তাঁর পরিবার। সম্ভান্ত্র পরিবারের সন্তান হয়েও বাবার ইচ্ছায় গ্রামের রুহিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। সুলতান বলেন, শিক্ষাজীবনে কখনও দ্বিতীয় হননি। মাধ্যমিকের ফলাফল ঘোষণা হওয়ার পর স্বয়ং উত্তরবঙ্গের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ রুহিয়া ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান নুরুল হক বোমবার্ড আমাকে পুরস্কৃত করেছিলেন। ভাগ্যের পরিহাসে বাবা-মা দু’জনই অসুস্থ হওয়ার পর, পড়াশোনার পাঠ গুটিয়ে নেয় সুলতান আলী। সেখানেই শুরু করেন গৃহ শিক্ষকতা।
তাঁর পড়ানোর ধরনে দূরদূরান্ত থেকে শুরু হয় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ডাক। এলাকার প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, এক সময় প্রচলিত ছিল কালিতলা থেকে কুজিশহর যেখানেই অঙ্কের ভালো ছাত্র দেখবেন, ধরে নেবেন সে সুলতানের ছাত্র। খন্ডকালীন শিক্ষকতা করেন রুহিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, মুজামন্ডল প্রাথমিক বিদ্যালয় ও শহীদ ফাদার লুকাশ প্রাথমিক বিদ্যালয়।
আক্ষেপের সুরে সুলতান আলী বলেন, মাসের পর মাস বেতন না দিয়ে, শেষ পরীক্ষাটির সঙ্গে সঙ্গে গায়েব হয়ে গিয়েছে কত ছাত্র ও অভিভাবক। ছাত্রদের ভালোবেসে পড়ানোর স্বীকৃতিও মেলেনি স্থানীয় কারও কাছ থেকে। আমার ছেলে সন্তান নেই, একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিয়েছি বহুদিন আগে। অভাবগ্রস্ত মেয়েটাই আমার যতটুকু সম্ভব খোঁজ নিতে আসে। কর্মক্ষম শরীর আর অসুস্থ বউ নিয়ে পড়ে আছি অনটনের পূর্ণগ্রাসে, খোঁজ রাখেনি কেউ।’
তিনি আরও বলেন, শিক্ষাক্ষেত্রের সবচেয়ে বড় অসংগঠিত আমার শ্রমক্ষেত্রটি অনেকের কাছেই শর্টকাটে জীবন কাটানোর উদাহরণমাত্র।’
ছেলেমেয়েরা ভুলে গেছে তাঁদের বিকেল-সন্ধ্যায় পড়াতে আসা সেই সুলতান স্যারের কথা। যিনি মাথায় একটা আলতো টালা মেরে নিমেষে বুঝিয়ে দিতেন, না মেলা জ্যামিতির এক্সট্রা বা পরিমিতির অঙ্ক, খুঁটিয়ে দেখে দিতেন হোমওয়ার্কের খাতা। আমরা যাঁরা তাঁর শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত, তাঁরা কি পারি না, তাঁর পাশে দাঁড়াতে?
আপেল মাহমুদ, রুহিয়া (ঠাকুরগাঁও)
