আমার দেখা কানাডার এক শান্ত, সুশৃঙ্খল ও উত্তেজনাহীন নির্বাচন

মো: শরিফুল ইসলাম আকন্দ
জীবনের পথে হাঁটতে হাঁটতে আমরা নানাভাবে নতুন কিছু দেখি ও শিখি। বিদেশে থাকলে সেই শেখার পরিসর আরও প্রসারিত হয়—কারণ একেবারেই ভিন্ন দেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি আর সামাজিক আচরণ খুব কাছ থেকে শেখার সুযোগ পাই।
২০২৫ সালের ২৮ এপ্রিল কানাডার ৪৫তম ফেডারেল নির্বাচনটি আমার দেখার সুযোগ হয়েছিল। এটি সত্যিই আমার কাছে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। ৩৪৩টি আসনের মধ্যে লিবারেল পার্টি পেল ১৬৯, কনজারভেটিভ পার্টি ১৪৭, ব্লক কেবেকোয়া ২৩, এনডিপি ৭ এবং গ্রিন পার্টি ১টি। ভোট কাস্টিং ছিল ৬৯.৫%—১৯৯৩ সালের পর সবচেয়ে বেশি।
নির্বাচনের পরে এনডিপি নেতা জগমিত সিং নিজে থেকেই দায়িত্ব ছাড়লেন। নির্বাচনের আগেও কিছু মন্ত্রী নানান ইস্যুতে স্ব স্ব দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয় প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর পদত্যাগের মধ্য দিয়ে—তিনি দলের স্বার্থে দায়িত্ব ছেড়ে দেন। এখানেই বোঝা যায়, কানাডায় ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত কিছু হিসেবে দেখা হয় না; বরং জনগণের সেবা করার এটা সাময়িক দায়িত্ব মাত্র।
নির্বাচনের পরিবেশ: পরিবেশ শান্ত, স্বাভাবিক, কোনো বাড়াবাড়ি নেই। কানাডার নির্বাচনী পরিবেশ দেখে আমি সত্যিই অবাক হয়েছি—
এটা আমার দেখা সবচেয়ে শান্ত, উত্তেজনাহীন ও সুশৃঙ্খল নির্বাচন।
এখানে ভোটাররা আবেগ দিয়ে ভোট দেয় না—ভাবনা-চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেয়।
কেউ কাউকে ভয় দেখায় না, দলীয় নেতারা টাকার প্রভাব খাটায় না, সময় অসময় মাইক বাজে না।
শহরজুড়ে পোস্টার–ব্যানার নেই, স্লোগান নেই, হেঁটে বেড়ানো ঝড়ো প্রচার নেই।
পার্ক, শপিং মল বা পাড়া-মহল্লায় শুধু ছোট ছোট সাইনবোর্ড—প্রার্থীর নাম লেখা।
প্রার্থীরা মিডিয়ায় গিয়ে কথা বলে, টিভি বিতর্কে অংশ নেয়। পেপার পত্রিকা না পড়লে কিংবা টিভির সামনে না বসলে নির্বাচন কি তা বোঝা যায় না। প্রার্থীরা কিংবা প্রার্থীর পক্ষে কেউ কেউ বাড়িতে গিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে কথা বলে আসে। কেউ বাসায় না পেলে দরজার সামনে লিফলেট রেখে যায়। ছোট দলের প্রার্থীরা নিজেরাই ঘুরে ঘুরে ভোট চান। ধর্মীয় উপাসনালয় বা কমিউনিটি সেন্টারেও প্রার্থীরা মানুষের সঙ্গে কথা বলেন খুব স্বাভাবিকভাবে—কৌতুক করেন, গল্প করেন, দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা জানান।
এদেশের মানুষ সচেতন। তাঁরা বোঝে কে কথার মূল্য রাখতে পারবেন। অযৌক্তিক প্রতিশ্রুতিতে কেউ ভোলেন না।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ভোট নিয়ে কৌতূহল:
কানাডায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা ভোট নিয়ে বেশ কৌতূহলী। অনেকে রিফিউজি আবেদন করেছেন, কেউ এসেছেন পরিবার-পরিজন নিয়ে। কেউ কেউ স্কিল ইমিগ্রেশন নিয়ে এসেছেন। কেউ কেউ পড়াশুনা শেষ করে কানাডার বিভিন্ন প্রভিন্সের নির্দিষ্ট নিয়মে পিআর এর জন্য অ্যাপ্লাই করেছেন, ইত্যাদি। এদেশে অনেকে প্রথম প্রজন্মের নাগরিক নন। তাই এখানে কোন দল প্রবাসীবান্ধব—এটা নিয়ে তাদের মাঝে আলোচনা থাকে।
ভোটের দিন—একেবারে স্বাভাবিক কর্মদিবস:
ভোটের দিন স্কুল, কলেজ, ব্যাংক-বিমা, অফিস–আদালত সব খোলা থাকে। আমার ছেলের স্কুলের জিমনেসিয়ামেই ভোটকেন্দ্র ছিল—স্কুলের স্বাভাবিক কাজকর্ম চলেছিল, শুধু সেদিন জিম কক্ষে ছাত্ররা খেলতে পারেনি।
বিকেলে ( সেসময় ৯:৩০ টার দিকে সূর্য অস্ত যেত) স্কুল মাঠে ছেলেকে খেলতে নিয়ে গিয়ে দেখি তখনো ভোট চলছে—মানুষ শান্তভাবে নিজের সুবিধামতো এসে ভোট দিচ্ছে। পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনীর বিশেষ টহল নেই, কারণ দরকারই হয় না। ভয়ের কোনো পরিবেশ নেই।
আগাম ভোট ও মেইল ব্যালট—সবার অংশগ্রহণ:
কানাডায় চাকুরিজীবী বা ব্যস্ত মানুষ আগেভাগেই ভোট দিয়ে নিতে পারে। নির্দিষ্ট কেন্দ্রে গিয়ে এডভান্স ভোট দেওয়া যায়। ইলেকশন কানাডা অফিসেও ভোট দেওয়া যায়। চাইলে মেইল ব্যালটেও আগাম ভোট দেওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশের অন্তবর্তীকালীন সরকারের আমলে মেইল ব্যালটের মাধ্যমে প্রবাসী ও দেশে ভোট কার্যে ডিডটিরতদের জন্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করা এ সরকারের একটা মহৎ উদ্যোগ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবদান। আজীবন দেখেছি বাংলাদেশের সরকারী কিংবা বেসরকারী কিংবা প্রাইভেট জবধারীরা কিংবা যারা ভোটের ডিউটি করে তাদের অনেকেই ভোট দিতে পারেন নাই। মেইল ব্যালট কিংবা আগাম ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করলে সবাই ভোটারাধীকার প্রয়োগ করতে পারবেন। ভোট নাগরিক অধিকার। অনেক দেশে ভোট দেওয়া বাধ্যতামুলক যেমন, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। এ সবদেশে ভোট না দিলে জরিমানা গুণতে হয় এবং সরকারী সেবা পেতেও বেগ পোহাতে হয়।
বাংলাদেশের বাস্তবতা—এক ধরনের ভিন্ন অভিজ্ঞতা:
বাংলাদেশে নির্বাচনের সময় পরিবেশ অনেক সময় অস্থির হয়ে যায়—
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, যানবাহন সীমিত, সহিংসতার আশঙ্কা, দলীয় সংঘর্ষ, হুমকি–ধামকি…
ভোট যেন উৎসব নয়—বরং ভয়ের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। কালোর টাকার প্রভাবে ভোটের রাতে অনেকে ভোটের দৃশ্যপট পাল্টে ফেলায়।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—পরাজিত দল অনেক সময় ফলাফল মেনে নিতে চায় না, কারণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থা দুর্বল। নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও গণমাধ্যম—সবকিছু এক ধরনের সন্দেহের মধ্যে পড়ে যায়।
কানাডার নির্বাচন সফল হয় কেন?
কানাডার নির্বাচনব্যবস্থা সফল কারণ—
নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক নির্বাচন কমিশন,
সহিংসতাহীন ভোট পরিবেশ, অগ্রিম ভোট ও মেইল ব্যালট ব্যবস্থা, রাজনৈতিক অর্থায়নের স্বচ্ছতা, প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি ও স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীন ভূমিকা, প্রশাসন ও আইন বিভাগের নিরপেক্ষতা অধিকন্তু জনগন সচেতন।
এই বিষয়গুলো মিলেই কানাডার মানুষ ভোটকে ভয়ের কিছু মনে করে না—বরং সাধারণ জীবনের অংশ হিসেবেই দেখে।
শেষ কথা
কানাডার নির্বাচন আমাকে মনে করিয়ে দেয়—গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট দেওয়া নয়, বরং এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে ভোট জীবনের স্বাভাবিক ধারার সঙ্গে মিশে থাকে। বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে একটি অংশগ্রহণমূলক ও আস্থাভাজন গণতন্ত্র গড়ে তুলতে চায়, তবে নিজ কিংবা দলের স্বার্থের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে জবাবদিহিতা, প্রতিষ্ঠানগত শক্তি এবং নাগরিক আস্থার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ, প্রশাসন বিভাগ ও গণমাধ্যমকে নিজ নিজ কাজে দায়িত্বশীল হতে হবে।
লেখক: কানাডা প্রবাসী
