বছর শেষের স্বপ্ন

ভোরবেলার একটা আলাদা মাধুর্য থাকে, শান্ত, স্নিগ্ধ, নিশ্চুপ প্রকৃতি। তার সাথে থাকে অফুরন্ত স্বপ্ন আর এক বুক আশা। এমন আশায় বুক বেঁধেই বোধহয় সদ্য ছেঁড়া ঘুড়িটিও পাক খেতে খেতে মাটিতে পড়ার বদলে আটকে থাকে গাছের কোনো উঁচু ডালে। এমন আশায় বুক বেঁধেই দুই পা বিহীন ‘হরি বুধা মাগার’ ছুঁয়ে ফেলেন এভারেস্টের চূড়া, আবার দৃষ্টিবিহীন ‘মেলানি ব্যারাট’ অবলীলায় পেরিয়ে যান ইংলিশ চ্যানেল। এছাড়া অন্যান্য অনেক উদাহরণ তো আছেই। তবে তা নিয়ে লিখতে বসলে ভূমিকাতেই যে আটকে থাকতে হয়।
এ তো গেল লক্ষ্য পূরণের উদাহরণ। আর যারা লক্ষ্যে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে লড়াই করে চলেছে দিনরাত, তাদের মধ্যে কেউ লক্ষ্যে পৌঁছায়, কেউবা লক্ষ্যের ধার ঘেঁষে ঘুরে বেড়ায়, আবার কেউ লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় প্রাত্যহিক জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে, এমন মানুষগুলোকে নিয়ে কখনো কোন হইহুল্লোড় হয় না। উপরন্তু বেশ কিছু নেতিবাচক মন্তব্য ধেয়ে আসে সমাজের এই ছক ভাঙা মানুষগুলোর দিকে।ধরে নিন ভোরের লক্ষ্মীকান্তপুর লোকালে চেপে যে মেয়েটি রোজ কলকাতায় আসে আয়ার কাজ করতে , শ্যাম বর্ণা, রোগা, ৩০ ছুঁই ছুঁই মেয়েটি ইতিমধ্যেই পরিবারের কাছে বোঝা, প্রেমিকের কাছে অতি সাধারণ, পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-পরিজন সকলের মানা সত্ত্বেও সে তার নিজের পায়ের তলার মাটি এমনই শক্ত করে গড়ে নিতে বদ্ধপরিকর।
কিংবা ধরুন, যে ছেলেটি উবার বাইকে চড়ে আপনাকে এইমাত্র পৌঁছে দিয়ে গেল ঝাঁ চকচকে অফিস বিল্ডিংটার সামনে,কাজের ফাঁকে, পড়াশোনার ফাঁকে, আশপাশের মানুষগুলোর কটূক্তি সামলে,এভাবেই সে প্রতিদিন বাড়তি কিছু উপার্জন করে আগামী দিনের স্বপ্ন পূরণের জন্য।
গত পরশু বাজার করতে গিয়ে, মধ্যবয়সী যে মহিলার ন্যাড়া মাথার দিকে চোখ আটকে গিয়েছিল,আলাপচারিতায় জানতে পারলাম,পাঁচ নম্বর কেমোর পর উনি সুস্থ হয়ে দিব্যি বাজার করছেন। আগে একটা রুমাল বাঁধতেন মাথায়, এখন আর সেসবের ধার ধারেন না।
এভাবেই যে রোজ কত মানুষ জিতে যায় একটু একটু করে, তিক্ত সম্পর্কের রেশ কাটিয়ে, ভগ্নপ্রায় মনকে নতুন করে জোড়া লাগিয়ে, রিহ্যাবের চার দেওয়ালের অন্ধকার দিনগুলো পেরিয়ে,আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে, কিংবা সন্তান হারানোর পরও ঠিক আগের মতই,কাজের ফাঁকে আনমনে গুনগুন করে গানের ক’টা কলি গেয়ে,এমন করেই দিন যায়, মাস যায়, বছর ঘোরে,আর ভাঙ্গা ভাঙ্গা মানুষগুলো আবার নতুন করে জোড়া লাগে। বেঁচে থাকুক এমন জোড়া লাগা প্রতিটা মানুষ,বেঁচে থাকুক তাদের মুখের হাসি,যে হাসি আমার মতো অতি সাধারণ মানুষকেও আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখায়। তাই তো বছর শেষের দিনগুলোর বাতাসে যখন ক্রিসমাস কেকের মিষ্টি গন্ধের সাথে সদ্য পোড়া মানুষের টাটকা মাংসের গন্ধ মিলেমিশে একাকার, তখনো এক বিন্দু আশার আলোর মতো নচিকেতার গানের সেই দুটো লাইন মনে পড়ে যায় খুব।
“একদিন ঝড় থেমে যাবে / পৃথিবী আবার শান্ত হবে।”
আসন্ন নতুন বছরে এই আশাই বাস্তবায়িত হোক। পৃথিবীর বুকে শান্তি নেমে আসুক সেই সমস্ত মানুষের হাত ধরে, যারা ভাঙা ভাঙা সব টুকরোগুলোকে সযত্নে কুড়িয়ে নিয়ে আবার নতুন করে জোড়া লাগাতে বিশ্বাসী। সোনার কাঠি ছুঁইয়ে এরাই জুড়ে রাখে দেশ, ভাষা, মানুষ, জাতি—সর্বাপেক্ষা একটা আস্ত গোটা পৃথিবী। প্রতিনিয়ত এমন বিধ্বংসী আগুনের সামনে দাঁড়িয়েও তাই পৃথিবী আজও আবর্তিত হয় তার নিজস্ব ছন্দে, আর আমাদের চোখের সামনে আবার ধরা দেয় একটা নতুন ভোর।
