ব্রাত্য বসু: বহুমাত্রিক বিরল প্রতিভা

সাহিত্য, রঙ্গমঞ্চ, চলচ্চিত্র, শিক্ষা এবং রাজনীতির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছেন এক অসাধারণ প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব—ব্রাত্যব্রত বসু রায়চৌধুরী, যিনি সাধারণত ব্রাত্য বসু নামেই পরিচিত। বাংলার সমকালীন সাংস্কৃতিক ইতিহাসে তাঁর অবদান অসামান্য এবং বহুমাত্রিক। সৃজনশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছেন তিনি। একাধারে তিনি নাট্যকার, অভিনেতা, পরিচালক, সাহিত্যিক, অধ্যাপক এবং রাজনীতিবিদ—বাঙালি জাতির ইতিহাসে এই ধরনের বহুমুখী প্রতিভার উদাহরণ বিরল। ২০০৯ সাল থেকে খুব কাছ থেকে দেখছি এই বিরল প্রতিভাকে। বাম বিকল্পের সন্ধানে তৃণমূল কংগ্রেসের জয় সুনিশ্চিত করতে বহু আন্দোলনের মুখ হয়েছেন তিনি। বামফ্রন্ট সরকারের পতন ঘটাতে তাঁর জ্বালাময়ী বক্তব্য সেই সময় ভেসে উঠত টেলিভিশনের পর্দায়। হাজার ব্যস্ততার মধ্যেও তাঁর ক্ষুরধার কলম সর্বদা সচল থেকেছে। যুক্তিতর্কের নিরিখে তাঁর প্রতিবাদী লেখা, বক্তব্য, নাটক, সিনেমা, অভিনয়, পথসভা, মিছিল গণ আন্দোলনের পথ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যখন‌ যে কাজ তিনি করেছেন, দক্ষতা ও পরিশ্রমের সঙ্গে করেছেন, ফলস্বরূপ প্রতিটি ক্ষেত্রেই চূড়ান্তভাবে সফল। বর্তমানে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।

১৯৬৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ব্রাত্য বসু’র জন্ম। কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। প্রথমে প্রেসিডেন্সি কলেজ (বর্তমানে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক এবং পরবর্তীতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। শিক্ষাজীবন শেষে কলকাতার সিটি কলেজে বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা। তবে তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনের যাত্রা শুরু হয়েছিল আরও আগে, কলেজ জীবনে ‘গণকৃষ্টি’ নামক থিয়েটার গ্রুপের সাউন্ড অপারেটর হিসেবে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে। খুব দ্রুত তিনি এই দলের সঙ্গে নাটক লেখা ও পরিচালনা শুরু করেন, যা তাঁর নাট্যজীবনের ভিত্তি স্থাপন করে। আল্ট্রা-মডার্ন নাটক অশালীন (১৯৯৬) তার রচিত প্রথম নাটক। এই শুরুর দিনগুলিতেই তিনি তাঁর সৃজনশীল কর্মধারার বীজ বপন করেন, যা পরবর্তীকালে তাঁকে বাংলা নাট্যজগতের এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভে পরিণত করে।

১৯৯৬ সালে, ব্রাত্য বসু তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য নাটক ‘শাহর ইয়ার’ লেখেন, যাকে সমালোচকরা বাংলা থিয়েটারের প্রথম উত্তর-আধুনিকতাবাদী নাটক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এই নাটকের মাধ্যমে তিনি বাংলা থিয়েটারে নতুন এক বিপ্লব আনেন, প্রচলিত নাট্যধারার বাইরে গিয়ে উদ্ভাবনী পদ্ধতিতে গল্প বলার কৌশল উদ্ভাবন করেন। তাঁর নাটকগুলিতে রাজনৈতিক দর্শন, প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক, সংগীত ও জীবনের মধ্যকার বন্ধন, নৈতিক মূল্যবোধ এবং তার অভাব, প্রেম ও বিদ্রোহের দ্বন্দ্ব এবং সময় ও সংস্কৃতির সম্পর্ক—এই সমস্ত জটিল বিষয়গুলি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও সূক্ষ্মভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। তিনি থিয়েটারকে নিছক বিনোদনের মাধ্যম না রেখে এক অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন, দার্শনিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণের স্থান করে দিয়েছেন। ২০০৮ সালে তিনি নিজের থিয়েটার গ্রুপ ‘ব্রাত্যজন’ প্রতিষ্ঠা করেন, যার প্রথম প্রযোজনা ছিল ‘রুদ্ধসঙ্গীত’। এই নাটকটি রবীন্দ্র সংগীতের কিংবদন্তি দেবব্রত বিশ্বাসের প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জীবন সংগ্রামের কাহিনি অবলম্বনে রচিত। নাটকটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করে এবং এখন পর্যন্ত ১৫২টিরও বেশি শো মঞ্চায়িত হয়েছে, যা বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে একটি রেকর্ড। তাঁর নাট্যচর্চা নানা দিক থেকে বিস্তৃত—রাজনীতি, প্রেম, প্রতারণা, বিদ্রোহ, প্রযুক্তি, মানবিকতা, আধ্যাত্মিকতা—সবই তাঁর নাটকে স্থান পায়। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য নাটকগুলির মধ্যে রয়েছে–- ‘অরণ্যদেব’, ‘ভাইরাস-এম’, ‘উইঙ্কল-টুইঙ্কল’, ‘চতুষ্কোণ’, ‘হেমলাত-গরানহাটার রাজকুমার’, ‘কৃষ্ণগহ্বর’, ‘সাতেরোই জুলাই’, ‘বিকেলে ভোরের ষোড়শী ফুল’, ‘সুপারি কিলার’ এবং ‘বোমা’। প্রতিটি নাটক আলাদা এক জগৎ, যার মধ্যে দর্শক প্রবেশ করে এবং ভাবনার খোরাক পায়। তাঁর নাটকগুলি চারটি খণ্ডে সংকলিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে, যা বাংলা নাট্য সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এছাড়া তিনি নাট্যতত্ত্ব, উপন্যাস, নাট্য সমালোচনাও লিখেছেন। নাটকগুলো একাধারে পাঠ্য ও মঞ্চোপযোগী—এই দ্বৈত বৈশিষ্ট্য বিরল।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তাঁর ‘হেমলাত-গরানহাটার রাজকুমার’, যেটি শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট‘ নাটকের সমসাময়িক ও দেশীয় অভিযোজন। এই নাটকটি শুধু বাংলা নাট্যজগতেই নয়, আন্তর্জাতিক স্তরেও গবেষকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রামা এবং থিয়েটারের প্রফেসর স্যাম কোলোদেজ থেকে শুরু করে, কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন সহযোগী অধ্যাপক এন্টনি জোহাই—সকলেই এই অভিযোজনের প্রশংসা করেছেন। পূর্ব ভারতের শেক্সপিয়র সোসাইটির আজীবন সদস্য জোহাই শেক্সপিয়রের মূল পাঠের সমসাময়িক ভারতীয়করণ দ্বারা এতটাই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন যে তিনি এই বিষয়ে ভারতজুড়ে বক্তৃতা করেছিলেন। মিঃ জোহাই দ্য ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ কালচারাল স্টাডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেস-এর ভল-ভি, নং অষ্টম-এ হেমলতের উপর একটি গবেষণামূলক প্রবন্ধও লিখেছেন। ২০১৫ সালে ‘বোমা’ এবং পরবর্তীকালে ‘মীরজাফর’ নাটকের মাধ্যমে তিনি বাংলার ইতিহাসের অকথিত দিকগুলি তুলে ধরেন। ‘বোমা’ একটি পিরিয়ড পিস যা বাঙালি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মুখোশ ছিঁড়ে দেয়। নাটকটি যেন ভিন্ন চোখে বিপ্লবী আন্দোলনকে দেখতে শেখায়। বিপ্লবীদের দুর্বলতা, অনৈক্য, ঈর্ষা, কুৎসা, ভয়, অপছন্দ, ব্যক্তিগত স্বার্থ, আকাঙ্ক্ষা, অবিশ্বাস, অহংকার সব‌ই ধরা রয়েছে নাটকটিতে। ‘মীরজাফর’ নাটকটি বিশেষভাবে ক্ষমতার রাজনীতি, মানসিক দ্বন্দ্ব এবং বিশ্বাসঘাতকতার জটিল অন্তর্নিহিত কারণগুলি অনুসন্ধান করে, যা ‘মীরজাফর’কে শুধুমাত্র একটি ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে নয়, বরং একটি সর্বজনীন প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করে। তাঁর নাটকগুলি হিন্দি, ইংরেজি, এবং ফরাসি ভাষায় অনূদিত হয়েছে, যা তাঁর সৃষ্টিকর্মের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রমাণ। নাটক লেখা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য তিনি বহু পুরস্কার লাভ করেছেন, যেমন—শম্ভু মিত্র সম্মান (২০১৬), খালেদ চৌধুরী সম্মান (২০১৭), শিল্পায়ন সম্মান (২০১৭), গজেন্দ্রকুমার মিত্র-সুমথনাথ ঘোষ মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড (২০১৮), সুপ্তাং পুরস্কার, দ্রোণাচার্য সম্মান (২০১৯), সত্যেন মিত্র স্মৃতি পুরস্কার (২০০১, ২০০৩, ২০০৪) ইত্যাদি। ব্রাত্য বসু সমকালীন বাংলা নাটকের এক অনন্য প্রতিভা। তাঁর নাট্যচিন্তা শুধুই নাটক নয়—তা একপ্রকার সমাজপাঠ, ইতিহাসপাঠ, এবং মানবমনের অন্তর্জগতে প্রবেশের এক অনুপম যাত্রা। তাঁর নাটক দেখে যেমন বোধ জাগে, তেমনই সাহিত্য হিসেবে পাঠ করলেও নতুন আলোকপাত ঘটে। তিনি বাংলা থিয়েটারকে কেবল মঞ্চে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজের এক বৃহত্তর চর্চার পরিসরে নিয়ে গেছেন। তাই বলা যায়, ব্রাত্য বসু শুধু নাট্যকার নন—তিনি বাংলা থিয়েটারের এক বিপ্লবী শক্তি।

বাংলা থিয়েটারে তাঁর অবদানের পাশাপাশি, ব্রাত্য বসু চলচ্চিত্র জগতেও নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় সৃষ্টি করেছেন। তিনি একাধারে চিত্রনাট্যকার, পরিচালক, অভিনেতা ও প্রযোজক। তাঁর চলচ্চিত্র-ভাষা যেমন বুদ্ধিদীপ্ত, তেমনই রাজনৈতিক ও দার্শনিক মাত্রায় সমৃদ্ধ। তাঁর সিনেমা কেবল বিনোদন নয়—তা একপ্রকার চিন্তনের ক্ষেত্রও। ব্রাত্য বসু ২০০৩ সালে চলচ্চিত্র পরিচালনায় আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর পরিচালিত ছবিগুলিতে তিনি থিয়েটারের ভাষা, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা চলচ্চিত্র-মাধ্যমে অনুবাদ করেছেন। রাস্তা (২০০৩) ব্রাত্য বসুর পরিচালিত প্রথম ছবি। ‘রাস্তা’ ছবিটি যুবকদের সন্ত্রাসবাদের দিকে ধাবিত হওয়ার কারণগুলি অনুসন্ধান করেছে, যা সমসাময়িক সমাজের জ্বলন্ত সমস্যা। ‘তিস্তা’ চলচ্চিত্রটি রোমান্সের ব্যর্থতা এবং প্রেমের জটিল মানসিকতাকে তুলে ধরেছে। এখানে নারীর অস্তিত্ব সংকট এবং আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন জোরালোভাবে উঠে আসে। এই ছবিতে ব্রাত্য বসুর রাজনৈতিক ও দার্শনিক চিন্তা আরও সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ পায়। ডিকশনারি (২০২১) বুদ্ধদেব গুহর গল্প অবলম্বনে নির্মিত। এই ছবিতে ভাষা ও সম্পর্কের দ্বন্দ্বকে বিমূর্ত কিন্তু অর্থবহভাবে চিত্রিত করা হয়। ছবিটি নেপাল আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা ফিচার ফিল্মের জন্য গৌতম বুদ্ধ পুরস্কার অর্জন করে। তার শেষ নির্মিত চলচ্চিত্র ‘হুব্বা’। এই বায়োপিক চলচ্চিত্রটি হুগলির কুখ্যাত গ্যাংস্টার শ্যামল দাস ওরফে ‘হুব্বা শ্যামল’-এর জীবনী অবলম্বনে নির্মিত। অভিনেতা হিসেবেও তিনি বিভিন্ন চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন, যার মধ্যে ‘কালবেলা’, ‘ইচ্ছা’, ‘স্থানীয় সংবাদ’, ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’, ‘হেমলক সোসাইটি’, ‘মুক্তধারা’, ‘ডাবল ফেলুদা’, ‘বারান্দা’, ‘যোগাযোগ’, ‘কন্ধিযুগ’, ‘অসমাপ্ত’, ‘ধুলোবালি কথা’, ‘মায়ার জঞ্জাল’, ‘মানিকবাবুর মেঘ’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এসব চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি একজন বহুমুখী অভিনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যিনি গভীর এবং জটিল চরিত্রগুলিকে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে মঞ্চে ও পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে পারেন। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলি বৈচিত্রময় এবং গভীর, যা দর্শকদের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলেছে। তাঁর পরিচালিত চলচ্চিত্রগুলি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রদর্শিত হয়েছে এবং সেখানে বিভিন্ন পুরস্কার লাভ করেছে, যা তাঁর পরিচালকীয় দক্ষতার প্রমাণ। ব্রাত্য বসুর চলচ্চিত্রগুলি সাধারণত সমাজের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক সংগ্রাম এবং সমকালীন সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির গভীর বিশ্লেষণ উপস্থাপন করে, যা দর্শকদের গভীর চিন্তার উদ্রেক করে। ব্রাত্য বসুর চলচ্চিত্র জগতে এই বহুমুখী অবদান বাংলা সিনেমাকে সমৃদ্ধ করেছে এবং তিনি একজন সৃজনশীল ও প্রতিভাবান চলচ্চিত্রকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাঁর নাটক ও চলচ্চিত্র সমাজের বিভিন্ন সমস্যা ও ইতিহাসকে তুলে ধরে সচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে।

ব্রাত্য বসু শুধুমাত্র নাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা নন, তিনি একজন সুদক্ষ সাহিত্যিকও। বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য ২০২১ সালে, তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত হন। তাঁর বাংলা থিয়েটারের সংকলন, ‘মীরজাফর ও অন্য নাটক’ (তিনটি নাটকের সংকলন: মীরজাফর, একদিন আলাদিন এবং অমি অনুকূলদা আর ওরা) এই পুরস্কার লাভের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রকের স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, সাহিত্য অকাদেমি কর্তৃক প্রদত্ত এই পুরস্কার বাংলা সাহিত্যে ব্রাত্য বসুর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি। তাঁর সাহিত্যিক কর্ম শুধুমাত্র নাটকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ধারাবাহিক উপন্যাস, সমালোচনা এবং বিভিন্ন বিষয়ের উপর গবেষণামূলক লেখা লিখেছেন। তাঁর লেখার বিষয়বস্তু বিচিত্র এবং ব্যাপক, রাজনৈতিক দর্শন থেকে শুরু করে সামাজিক সমস্যা, ইতিহাসের পুনর্পাঠ, মানবীয় সম্পর্কের জটিলতা সবই তাঁর লেখাতে উঠে আসে। ২০২২ সালে প্রকাশিত ‘অমৃতকথা’ উপন্যাসে তিনি বাঙালি থিয়েটারের বাণিজ্যিকীকরণ এবং অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি ও অমৃতলাল বসুর সম্পর্কের গভীরতা তুলে ধরেছেন। এবছর কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তাঁর নতুন বই—‘’নিরামিষ’ হিন্দু ভারত, ‘আমিষ’ সেকুলার ভারত’। নিরামিষবাদের যে তত্ত্ব মোদীজি একজন দক্ষ বানিয়ার মতোই গোটা দেশে ছড়াতে চাইছেন, তার সূত্রে তার অন্তর্গত রাজনীতি ওই উপমহাদেশে হিন্দু সমাজের প্রাচীন যুগের খাদ্যাভ্যাস এবং ধর্ম সম্পর্কিত ধারণাটির ঐতিহাসিক হদিস নিয়ে এই বই। বৈদিক সংহিতা, আরণ্যক, ব্রাহ্মণ, উপনিষদ, মহাকাব্য, পুরাণ, স্মৃতিশাস্ত্র থেকে বৌদ্ধসূত্র, সাহিত্য, ইসলামি ধর্ম পুস্তক অথবা লোকাচার, প্রবাদ, মীরার ভজন থেকে আধুনিক ঐতিহাসিক ও সংস্কৃতিবিদ্যার গবেষণা নিয়ে বিপুল তথ্য এবং উপাত্তের সাপেক্ষে রাজনৈতিক নিরামিষবাদের কাটাছেঁড়া করেছেন তিনি। সব্যসাচী লেখক হিসেবে তাঁর শিল্পীসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি এবং নিপুণ ভাষা ব্যবহার তাঁর লেখাকে অনন্য মাত্রা দিয়েছে। তাঁর বহু গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে এবং পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এছাড়াও, তিনি বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণাধর্মী লেখা লিখেছেন, যা উচ্চ মানের বৌদ্ধিক সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর লেখার শৈলী আধুনিক, যুক্তিসংগত এবং প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো সাহসী, যা পাঠকদের নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।

২০১১ সালে, ব্রাত্য বসু বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেন। তিনি উত্তর ২৪ পরগনার দমদম বিধানসভা কেন্দ্র থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে নির্বাচিত হন, সিপিএম মন্ত্রী গৌতম দেবকে পরাজিত করে। এই নির্বাচনের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় তাঁকে উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। দায়িত্ব পেয়ে তিনি রাজ্যের উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে সমীক্ষা শুরু করেন, যা পরবর্তীকালে রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাজনীতিতে প্রবেশের আগে, ব্রাত্য বসু বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। বামপন্থী রাজনীতির সমালোচক হিসেবে, তিনি পশ্চিমবঙ্গে বাম সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় স্টল থেকে শুরু করে রাজপথে আন্দোলনের প্রথম সারিতে, তিনি সর্বদা সক্রিয় ছিলেন। তাঁর তুখোড় বক্তৃতা এবং যুক্তিপূর্ণ বিশ্লেষণ তাঁকে একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ২০১৬ সালের মে মাসে, তাঁকে পর্যটন, বিজ্ঞান প্রযুক্তি এবং বায়ো-টেকনোলজি, তথ্যপ্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক্সের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এসব দায়িত্ব পালনকালে তিনি এসব বিভাগে নতুন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম চালু করেন এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের উল্লেখযোগ্য জয়ের পর, ব্রাত্য বসুকে পুনরায় শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। এই দায়িত্ব পালনকালে তিনি রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণ এবং উন্নত করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে অনেক নতুন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা রাজ্যের শিক্ষার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের বিতর্কিত জাতীয় শিক্ষা নীতির বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিবাদ করেছেন এবং রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তিনি পশ্চিমবঙ্গের তথ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক বিভাগের অধীনে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি এবং মিনার্ভা নাট্যসংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্রের চেয়ারপার্সন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন, যা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

ব্রাত্য বসুর সামগ্রিক ব্যক্তিত্ব এবং কর্মজীবন বিশ্লেষণ করলে একটি অসাধারণ বহুমাত্রিক প্রতিভার উজ্জ্বল ছবি উঠে আসে। নাটক লেখা ও পরিচালনা, অভিনয়, চলচ্চিত্র নির্মাণ, সাহিত্য সৃষ্টি, শিক্ষকতা এবং রাজনীতি—এই সমস্ত ক্ষেত্রে তিনি সমানভাবে পারদর্শিতা দেখিয়েছেন, যা অত্যন্ত বিরল। যেকোনো কাজ করার সময় তিনি তাতে সম্পূর্ণরূপে নিমগ্ন হন এবং সেই কাজটিকে চূড়ান্ত পর্যায়ে সফল করে তোলেন। এমনকি অত্যন্ত ব্যস্ত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করার সময়েও তিনি তাঁর সৃজনশীল কর্মকাণ্ড বন্ধ করেন না। হাজার ব্যস্ততার মধ্যেও তাঁর কলম সর্বদা সক্রিয় থাকে, যা তাঁর অসাধারণ প্রতিভা ও কর্মশক্তির প্রমাণ। নাটক, সিনেমা, সাহিত্য, এবং রাজনীতি—এই সমস্ত ক্ষেত্রেই তাঁর চিন্তাভাবনা অত্যন্ত প্রগতিশীল, সমাজের প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার মতো সাহসী এবং নতুন দিগন্তের সন্ধানী।

লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক উদার আকাশ।

আরও পড়ুন