শামীমা রসুলের লেখা ‘দৈনন্দিন জীবনে কারুশিল্প’

কারুশিল্প নিয়ে একটি ব্যতিক্রমধর্মী বই প্রকাশ করেছে স্বপ্ন ‘৭১ প্রকাশন। বইটির নাম দৈনন্দিন জীবনে কারুশিল্প। লিখেছেন লেখক ও গবেষক শামীমা রসুল। ছয়টি অধ্যায়ের সঙ্গে বইয়ের তথ্যসুত্র ও আলোকচিত্র রয়েছে। ৮০ পৃষ্ঠার এই বইটি পড়ে জানতে পারবেন কারুশিল্পের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ব্যবহারিক দিকের ভূমিকা ও সম্ভাবনার কথা।

বইটি লেখার পেছনে উদ্দেশ্য সম্পর্কে লেখক শামীমা রসুল বলেছেন. ‘বাংলাদেশের অধিকাংশ লোকই কৃষিনির্ভর। নদীমাতৃক দেশ। গ্রামীণ সংস্কৃতি ও নয়নাভিরাম সৌন্দর্য প্রতিটি মানুষের মন ও যুগলকে করে মহিমান্বিত। সেই সঙ্গে বিদেশি পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং চিন্তাধারাকে করেছে সূদুরপ্রসারী। তাই এখানে স্পষ্টভাবে বলতে হয় শিল্পীর কোনো জাত-কুল নেই। সব শিল্পী তার কর্মের প্রতি যত্নশীল ও বিশ্বাসী। তাই বলতে হয় চারুকলা বা কারুকলা যেটিই হোক না কেন শিল্পীর মননশীলতাই এখানে মুখ্য বিষয়। গ্রামীণ হস্তশিল্পই কারুশিল্প হিসেবে পরিচিত। যেমন—যাঁরা তাঁত নিয়ে কাজ করেন তাদের তাঁতি বলে। যাঁরা মৃৎশিল্প তৈরি করেন তাঁদের কুমার বলে। কারুশিল্প বা হস্তশিল্প মূলত গ্রামীণ শিল্প আর এই শিল্পচর্চা আমাদের দেশের বাইরের দেশগুলোতেও শিল্পকর্ম রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে।

তিনি আরও বলেন, ‘সবার মনে এই বিষয়টি যেনো প্রতিভাত হয় এবং আমাদের শিল্প ও সংস্কৃতিকে আরও নিবিড়ভাবে চর্চা করতে পারে। বিশেষত, এই বিষয়টি বাংলাদেশের কারুশিল্প বা হস্তশিল্পের চর্চা ও উন্নয়নের ভূমিকা রাখতে পারে—সে বিষয়ে আলোকপাত করেছি। তাই লেখক হিসেবে আশাবাদী বইটি শিক্ষার্থীদের উপকারে আসবে।’

ভূমিকায় লিখেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, তত্ত্ব ও সমালোচনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ তাহাজিবুল হোসেন। তিনি লিখেছেন-

‘‘মানুষ সভ্য হওয়ার অন্যতম প্রধান দুটি উপাদান হলো তার যৌক্তিক ও শৈল্পিক চিন্তাধারার বিকাশ। সভ্যতা বিকাশের আদিপর্বে মানুষ কৃষিকাজ ও পশুপালনের মাধ্যমে যাযাবর জীবন থেকে শৃঙ্খল জীবনে থিতু হওয়া শুরু করে। যৌক্তিক চিন্তাধার মাধ্যমে কৃষিকাজ ও কারিগরি বিষয়ে উৎকর্ষ সাধিত হয় এবং ক্রমাগত খাদ্যান্বেষণ ও পরিভ্রমণের প্রয়োজনীয়তা না থাকায় উদ্ভূত উদ্বৃত্ত সময়ে মানুষ তার শৈল্পিক দিকের বিকাশ লাভের সুযোগ পায়, যার সুপ্তরূপ আদিম গুহাচিত্রে দেখা যায়।

কালক্রমে কয়েক হাজার বছরে মানুষের শিল্পসত্তার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে; প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে প্রাচীন বৈদিক যুগে শিল্পশাস্ত্র রচিত হয় যেখানে চিত্রকলা, ভাস্কর্য, স্থাপত্য, নগর পরিকল্পনা, সংগীতশাস্ত্র, নৃত্যকলাসহ বিভিন্ন বিষয়ের শ্রেণিবিন্যাস দেখা যায়। ফাইন আর্টস বা চারুকলার বিশেষায়িত ক্ষেত্রগুলো সভ্যতার বিকাশে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। রেনেসাঁ, নিওক্লাসিকাল, মডার্ন, পোস্ট-মডার্নসহ বিভিন্ন বিপ্লব ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। প্রচলিত ফাইন আর্টস, স্থাপত্য, সাহিত্য প্রভৃতি সৃজনশীল ক্ষেত্র এবং সমকালীন সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও বর্তমান প্রেক্ষাপটে টেকনোলজি একে অপরকে পারস্পরিকভাবে প্রভাবিত করে।

সভ্যতার সাথে শিল্পের এই ক্রমবিকাশের সমান্তরাল কিন্তু প্রায় অপরিবর্তিত আরেকটি মাধ্যম হলো কারুশিল্প। ফাইন আর্টসের ক্ষেত্রে শিল্পকর্মের উদ্ভব ঘটে শিল্পীর ইচ্ছায়, যেখানে তার বিশ্বাস, অনুভূতি ও চিন্তার বহিঃপ্রকাশ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে প্রকাশিত হয়। বিপরীতে কারুশিল্পের উৎপত্তি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয়তা থেকে। যেমন—থালা-বাসন, সানকি, কিংবা শিকা; অথবা শীতলপাটি, ঝুড়ি, তালপাখা। শিল্পের মাত্রা সংযোজিত হচ্ছে যখন মানুষ সংশ্লিষ্ট পণ্য তৈরিতে তার হাজার বছরের জ্ঞান ও দক্ষতা, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যা বংশানুক্রমে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত, এবং এর সৌন্দর্যবর্ধনে তার নিজস্ব লোকায়ত আচার, বিশ্বাস, ধর্ম বা সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটায়। কারুশিল্পের ক্ষেত্রে কাঁচামালের বৈশিষ্ট্য খুব গুরুত্বপূর্ণ; মাটি, বাঁশ, বেত, কিংবা কাঠ থেকে একই ধরনের পণ্য তৈরি সম্ভব নয়, এর প্রক্রিয়া আলাদা। কাদামাটিকে হাতে যেভাবে আকার দেয়া যায়, বাঁশ কিংবা বেতের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়, বরং এদের আঁশের গঠনের কারণে বুনন প্রক্রিয়ার সাহায্য নিতে হয়।

ধাতব শিল্পের ক্ষেত্রে, যেমন—পিতল বা কাঁসা, ছাঁচের ব্যবহার দেখা যায়। নকশিকাঁথার বুননে লোকায়ত গল্প বা ঘটনার চিত্র ফুটে ওঠে। কারুশিল্প তাই কোনো একটি স্থানের একেবারে মাটি থেকে উঠে আসা একটি শিল্পমাধ্যম।

কারুশিল্পকে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি পেতে বেশ অপেক্ষা করতে হয়েছে। সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসে কারুশিল্পীরা ঐতিহাসিকভাবেই উপেক্ষিত ছিলেন; কামার, কুমার, ছুতোর, চামার—কটাক্ষের সম্বোধনে এদের নিচুবর্ণের পেশাজীবী হিসেবে দেখা হয়েছে এমনকি গত শতকের শুরুতেও। এদের বিভিন্ন পাড়ার নাম আজও পাওয়া যায়—পাটুয়াটুলী পটুয়া আর কামারদের জায়গা, শাঁখারিবাজারে শাঁখারিদের ডেরা, তাঁতিবাজার তাঁতিদের এলাকা, সূত্রাপুর সূত্রধরদের (যারা কাঠের কাজ করেন) কাজের স্থান, এরকম আরও অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে শুধু ঢাকা শহরেই। কিন্তু কারুশিল্প যে একটি নির্দিষ্ট স্থান বা দেশের জন্য আলাদাভাবে পরিচয় বহন করতে পারে এবং এর মধ্যেও যে গভীরভাবে সৃজনশীল শিল্পবোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে পারে তা বর্তমান সময়ে সহজেই অনুমেয়। চীনের মাটির কাজ আর বাংলার মাটির কাজ এক নয়, কারণ দুই দেশের মাটির উপাদান, মান, জলবায়ু, পণ্য তৈরির কারিগরি বিভিন্ন দিক অবশ্যই আলাদা, একই সাথে পাত্রের অলংকরণও নিজ নিজ দেশের বা স্থানের সাংস্কৃতিক বিভিন্ন বিষয়ের উপর নির্ভরশীল।

শিল্পবিপ্লব পরবর্তী সময়ে দৈনন্দিন জীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক জিনিসের উৎপাদন কারখানাগুলোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নতুন উৎপাদিত পণ্য কারুপণ্যের তুলনায় সহজলভ্য, ব্যবহারে সহজ ও দামে কম হওয়ায় কারুশিল্প হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে কারখানায় উৎপাদিত সমসাময়িক কাঁচামাল যেমন—প্লাস্টিক, পলিথিন, ও মেলামাইনের প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার প্রেক্ষিতে মানুষ আবার কারুশিল্পের প্রতি ঝুঁকছে। বেশির ভাগ কারুপণ্য সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদানে প্রস্তুত হওয়ায় এদের পরিবেশবান্ধব হিসেবে বিবেচনা করা যায়। দেশের পরিচিতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরার ক্ষেত্রেও কারুশিল্পের ভূমিকা অনবদ্য। বর্তমান সময়ে কারুশিল্প স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হবার অপার সম্ভাবনা উন্মুক্ত হচ্ছে।

এই বইটিতে শিল্পবিষয়ক গবেষক শামীমা রসুল বাংলাদেশের কারুশিল্পকে তুলে ধরার প্রয়াস নিয়েছেন এর ইতিহাস ও শ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে; একই সাথে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ব্যবহারিক দিক বিবেচনায় কারুশিল্পের ভূমিকা ও সম্ভাবনার কথাও বিবৃত করেছেন। বইটি সাধারণ পাঠককে দেশের বিস্তৃত ও বিস্মৃত বিভিন্ন ধরনের কারুশিল্পের ব্যাপারে অবগত করবে বলে বিশ্বাস করি।
বইটির সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল কামনা করছি।’’

আরও পড়ুন