নরওয়েজিয়ান উড: এক বিষণ্ণ তরুণের গল্প

মানুষের জীবন খুবই অদ্ভুত। এই অদ্ভুত জীবনে আমাদের আছে বিষণ্ণতা, আছে কিছু অপ্রাপ্তি। কোনো কারণ ছাড়াই আমাদের অযথা মন খারাপ হয়, আবার শূন্যতা ভর করে সব কিছুতেই। কমবেশি সবারই এমন অনুভূতি হয় আমাদের। আর সেরকমই একটি মৃত্যু শীতল বিষাদময় উপন্যাস হলো হারুকি মুরাকামির নরওয়েজিয়ান উড।
উপন্যাসটি ১৯৮৭ সালে জাপানে প্রকাশিত হয় এবং প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। এটি হারুকি মুরাকামির প্রকাশিত পঞ্চম বই। উপন্যাসের নামকরণ করা হয় বিখ্যাত ব্যান্ড দ্য বিটলস এর একটি গান থেকে। বইটির ভাষান্তর করেছেন এ সময়ের জনপ্রিয় লেখক আলভী আহমেদ। তাঁর লেখা এতই সাবলীল যে, মনে-ই হয় নি এটা অনুবাদ, পড়ে মনে হয়েছে এটি তাঁর নিজের লেখা।

একটি ইন্টারভিউয়ে মুরাকামি তার বই সম্পর্কে বলছেন; Image Source: bookstr
বইটা পড়ার পেছনে একটি সুন্দর গল্প আছে আমার। এটি উপহার হিসেবে পেয়েছিলাম একজন প্রিয় মানুষের কাছ থেকে। মূলত তার কাছ থেকেই আমার মুরাকামিকে জানা ও পড়া শুরু। এরপর একে একে তার অন্যান্য উপন্যাসগুলোতে ডুবে যেতে লাগলাম। মুরাকামির জগতে একবার ঢুকে গেলে সেখান থেকে বের হওয়া কষ্টসাধ্য। এক অন্যরকম বিষণ্নতায় আপনাকে নিয়ে যাবে কিন্তু সেই বিষণ্ণতা আপনি উপভোগ ও করতে পারবেন। মুরাকামির প্রত্যেকটা গল্পে বই ও মিউজিকের একটা আলাদা অবস্থান আছে, সেজন্যেই তার চরিত্ররা বিষণ্ণতা উপভোগ করতে পারে। একা থাকাটাও তখন আনন্দের হয়। তাঁর উপন্যাসে আরেকটা বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে আর তা হলো রেলস্টেশন, জাপানের বিভিন্ন রেলস্টেশনে বসে তার চরিত্ররা মানুষের জীবনের সঙ্গে ট্রেনের যাওয়া আসার একটা বিচ্ছিন্ন সম্পর্ক তৈরি করে।

উপন্যাসের নামকরণ করা হয় বিখ্যাত ব্যান্ড দ্য বিটলস এর একটি গান থেকে । ছবি: সংগৃহীত
মুরাকামি সাধারণত পরাবাস্তবতা নিয়ে লিখতে পছন্দ করে। তাঁর উপন্যাসের চরিত্ররা বাস্তব এবং অবাস্তব দুই জগতেই বাস করে। কিন্তু এই বইটি তাঁর ব্যতিক্রম, এখানে সবকিছুই খুব বাস্তব। মুরাকামি এটা ইচ্ছা করেই লিখেছেন, তিনি যে পরাবাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গে বাস্তব জীবন নিয়ে ও লিখতে পারেন তাঁর প্রমাণ এই উপন্যাস।
নরওয়েজিয়ান উড এর প্রধান চরিত্র তরু ওয়াতানাবে নামে এক যুবক। ওয়াতানাবের উপরে ষাটের দশকের মুরাকামির নিজের কিছু ছাপ রয়েছে। তার পছন্দ অপছন্দ অনেক কিছুই তরু ওয়াতানাবের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে। তরু ওয়াতানাবের ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনি নিয়ে গল্প এগোয়। নাওকো আর মিদোরি এই দুই মূল নারী চরিত্রকে কেন্দ্র করেই তরু ওয়াতানাবের জীবন ঘুরতে থাকে। উপন্যাসে দেখা যায় দুইজনকেই সে ভালোবাসে কিন্তু দুইজন সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্রের।
শীতকালও শীতল মৃত্যুর একটি রূপক, পুরো উপন্যাসেই যার ব্যাপ্তি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ঠাণ্ডা ও জমে যাওয়া পরিবেশ মৃত্যুর নির্দয় ও নৈসর্গিক রূপটি চিত্রায়িত করে। পুরো গল্প জুড়েই ওয়াতানাবে একটা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যায়। ওয়াতানাবের কিশোর জীবনের একমাত্র বন্ধু ছিল কিজুকি আর নাওকো ছিল কিজুকির প্রেমিকা। সেই সূত্রেই নাওকোর সঙ্গে তার পরিচয়। কিজুকির মৃত্যু ছিল তাদের জীবনে এক অস্বাভাবিক ঘটনা। তার আত্মহত্যার পেছনের কারণ শেষ পর্যন্ত জানা যায় নি। কিন্তু নাওকো নিজেকে দায়ী করতো এই মৃত্যুর জন্য, এই ট্রমা থেকে সে কখনো বের হতে পারে নি। এই সূত্র ধরেই ওয়াতানাবের সঙ্গে তার সম্পর্ক। ওয়াতানাবে সবসময় চেষ্টা করতো নাওকোকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার কিন্তু তার এই চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে নাওকো নিজেও আত্মহত্যার দিকে পা বাড়ায়।

হারুকি মুরাকামির বিখ্যাত উপন্যাস নরওয়েজিয়ান উড নিয়ে লেখক। ছবি: সংগৃহীত
আর মিদোরি ছিল তার ঠিক বিপরীত, বেশ প্রাণ শক্তিসম্পন্ন উচ্ছল একটি মেয়ে। টোকিওতে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে মিদোরির সঙ্গে পরিচয় হয় ওয়াতানাবের। মিদোরি ছিল খুবই বাস্তববাদী, সে জীবনকে দেখত অন্য চোখে। এই চরিত্রের প্রতি পাঠকদের অন্য রকম এক ভালোবাসা আছে। যে ব্যক্তি নিজের জীবনে সুখের সন্ধানে শুধু দুঃখই পেয়েছে, সে বইয়ের প্রতিটি চরিত্রের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পাবে।
মুরাকামি ষাটের দশকের টোকিওকে খুব যত্ন করে তার গল্পে চিত্রায়িত করেছেন। তিনি যে ছোটবেলা থেকেই পশ্চিমা সাহিত্য ও সভ্যতার প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন তা এই গল্পে উঠে এসেছে। গল্পের মধ্যে অনেক পশ্চিমা সাহিত্য, গান ও কবিতার রেফারেন্স আছে।
তরু এই গল্পে একটা দ্বিধার মধ্যে আটকা পরে যায়। সে মিদোরিকে পছন্দ করে কিন্তু একইসঙ্গে ভগ্নগ্রস্থ নাওকোর প্রতিও দায়িত্ব অনুভব করে। নিজের সঙ্গে নিজের এই টানাপোড়েনের চিত্রটা মুরাকামি অসম্ভবভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রতিটি মানুষই জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে এসে এরকম দ্বিধার সম্মুখীন হয়। মুরাকামি জীবনের এই পর্যায়গুলো এমন সুন্দর করে এখানে বর্ণনা করেছেন যে তা পাঠক হৃদয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করবে।
বইটা শেষ করার পর ও পাঠক এই ঘোর থেকে সহজে বের হতে পারবে না, একটা বড় সময়ের জন্য পাঠকের ভাবনাতে রয়ে যাবে গল্পটা।
নরওয়েজিয়ান উড
হারুকি মুরাকামি
ভাষান্তর : আলভী আহমেদ
প্রকাশন: বাতিঘর
পৃষ্ঠা: ৩৫২
মূল্য: ৬৬০ টাকা
