বাংলাপ্রেমী উইলিয়াম রাদিচে প্রয়াত

উইলিয়াম রাদিচে একজন কবি ও অনুবাদক। তিনি তরুণ বয়সেই কবি হিসেবে অক্সফোর্ডে পুরস্কৃত হন। সাহিত্যের প্রতি ছিল প্রবল ভালোবাসা। অক্সফোর্ডে পড়া শেষের তাঁর এক বন্ধুর পরামর্শে বাংলা ভাষায় কাজ করার উদ্বুদ্ধ হন। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের সম্পর্কে জেনে আরও বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তারপর থেকে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বহু কবিতা, গল্প এবং মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ যার তর্জমায় ইংরেজি ভাষাভাষী পাঠকদের পৌঁছে দিয়েছেন। সেই বাংলাপ্রেমী, কবি, অনুবাদক. গবেষক, অধ্যাপক উইলিয়াম রাচি সোমবার নর্থ ইংল্যান্ডে মৃত্যুবরণ করেন। বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর।

উইলিয়াম রাদিচে  তাঁর এক বক্তৃতায় বলেছেন, ‘নোবেল বিজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ নন, বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম নন, তাঁকে বাংলা ভাষার দিকে টেনেছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতা এবং জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান।’ একসময়ে রাদিচের পিতামহ এবং তারপর তাঁর পিতৃব্য বঙ্গদেশে আইসিএস অফিসার হিসেবে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। সেই সূত্রে হয়ত বা তিনি ছেলেবেলা থেকে বঙ্গদেশ এবং ভারতবর্ষের অনেক গল্প-কাহিনি শুনে থাকবেন, যা তাঁকে কৌতূহলী করে থাকবে।

আজ ১২ নভেম্বর, সোমবার, সকালে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে কলকাতার প্রখ্যাত কবি সুবোধ সরকার লিখেন, ‘উইলিয়াম রাদিচে চলে গেলেন। লন্ডনে তিনিই ছিলেন বাংলা ভাষার রাষ্ট্রদূত। রবীন্দ্রনাথকে মাথায় নিয়ে তিনি সারা জীবন ঘুরে বেরিয়েছেন পৃথিবীতে। সারা জীবন ধরে রবীন্দ্রনাথকে অনুবাদ করাই ছিল তাঁর নিয়তি ও নিস্তার। এমনকি তিনি নিজে একজন কবি হয়েও নিজের কবিতায় মন ঢেলে দিতে পারেননি, যতটা নিমগ্ন হতে পেরেছিলেন রবীন্দ্রনাথের কবিতায়। এ এক অলৌকিক আত্মহত্যা। ঠিক যেরকম হয়েছিল লিশম্যানের ক্ষেত্রে, তিনিও নিজের কবিতায় ডুবে না গিয়ে রাইনের মারিয়া রিলকের কবিতায় হারিয়ে গিয়েছিলেন। রাদিচে বাংলা ভাষাটা এতটাই ভালো জানতেন যে বাঁশদ্রোনীর বাজারে আলুর দাম নিয়ে দোকানিদের সঙ্গে তর্ক করতে দেখা যেত তাঁকে। সে তর্কটা ভাষাকে আরও্ মুখর করার জন্য,আলুর দাম কমানোর জন্য  নয়।

তিনি আরও লিখেন, ‘শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনটন বি সিলি, প্যারিসের ফ্রাঁস ভট্টাচার্য, হাইডেলবার্গের হানস এঁদের হাতে বাংলা ভাষা যেভাবে সম্মানিত হয়েছে, দেশ-বিদেশে বাংলা ভাষা যে পরিসর পেয়েছে তা অপরিসীম। উইলিয়াম রাদিচে চলে গেলেন, সঙ্গে সঙ্গে তিনি পকেটে করে একটা যুগ নিয়ে চলে গেলেন। বাঙালি কবে আবার আর একজন রাদিচে পাবে জানি না।’

উইলিয়াম রাদিচে ১৯৫১ সালে ১২ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। রাদিচের মা বেটি রাদিচেও ছিলেন ধ্রুপদী ল্যাটিন সাহিত্যকর্মের অনুবাদক ও সম্পাদক। তার পূর্বপুরুষ যুক্তরাজ্যে এসেছিলেন ইটালি থেকে।

প্রতিকৃতি: মাসুক হেলাল

২০১৬ সালে গবেষক ও লেখক গোলাম মুরশিদ প্রথম আলোতে তাঁর সর্ম্পকে লিখেছিলেন, ‘‘অক্সফোর্ডে বাংলা শেখার ব্যবস্থা ছিল না, তাই উইলিয়াম রাদিচে বাংলা শিখতে যান লন্ডনের সোয়াসে। সেখানে তিনি বিভাগের প্রভাষক তারাপদ মুখোপাধ্যায়ের কাছে বাংলা শেখেন। তার আগেই ১৯৬৯ সালের ডিসেম্বরে ক্লার্ক সাহেব মারা গিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন অধ্যাপক। তাঁর জায়গাতে জন ব্লোল্টন আর তারাপদ মুখোপাধ্যায় প্রভাষক হন। তারাপদ মুখোপাধ্যায়ের কাছে উইলিয়াম রাদিচে ভালো করেই বাংলা শেখেন, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গীয় সাহিত্যিক বাংলা। আমার ধারণা, তারাপদ মুখোপাধ্যায়ের কাছে রবীন্দ্রসাহিত্যেও তাঁর হাতেখড়ি হয়। রবীন্দ্রসাহিত্য দিয়ে সূচনাই হওয়াই তো স্বাভাবিক।

তিনি বিশেষ করে আকৃষ্ট হন রবীন্দ্রনাথের কাব্য পড়ে। তিনি রবীন্দ্রনাথের কাব্য অনুবাদ করতে আরম্ভ করেন। তাঁর সেই অনুবাদের মধ্য থেকে ৪৮টি নানা স্বাদের কবিতা নিয়ে ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: সিলেকটেড পোয়েমস নামে একটি কাব্যগ্রন্থ। প্রকাশক পেঙ্গুইন বুকস। এই সংকলন প্রকাশিত হওয়ার পর পশ্চিমা বিশ্বে রবীন্দ্রনাথ যেন নতুন জীবন লাভ করেন। প্রথম মহাযুদ্ধের ঠিক আগে এক বিশেষ রাজনৈতিক হতাশা এবং বিষণ্নতার মধ্যে গীতাঞ্জলির এক বিশেষ স্বাদের গান ও কবিতার জন্য তখনকার ব্রিটেনে এবং বৃহত্তর ইউরোপে রবীন্দ্রনাথ দারুণ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন। তারই সূত্র ধরে ১৯১৩ সালে তিনি সাহিত্যের জন্য সমগ্র এশিয়ার মধ্যে সবার আগে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর এই জনপ্রিয়তার সত্যিকার কারণ তিনি নিজেই জানতেন না। ফলে তিনি পরবর্তী কয়েক বছর যেসব সাহিত্য অনুবাদ করেন, তাকে পাঠকেরা একঘেয়েমি বলেই বিবেচনা করেন। প্রথম মহাযুদ্ধের জাতীয়তাবাদী উন্মত্ততাও রবীন্দ্রনাথের জনপ্রিয়তা লোপ করে দেয়। কারণ, তিনি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর জনপ্রিয়তা লোপের একটা প্রমাণ: ১৯২০-২১ সালেই অক্সফোর্ডের ইংরেজি কাব্যসংগ্রহে শেষবারের মতো রবীন্দ্রনাথের কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়। রবীন্দ্রনাথ খেয়া, গীতাঞ্জলি, গীতালি এবং গীতিমাল্য-এ প্রধানত আধ্যাত্মিকতার রহস্যময়তা দিয়ে আচ্ছন্ন পূজা, প্রেম এবং প্রকৃতির গানই রচনা করেননি, অন্য অনেক বিচিত্র আঙ্গিক এবং রসের কাব্য রচনা করেছিলেন। গীতাঞ্জলির অনুবাদের মধ্য দিয়ে পাশ্চাত্যের পাঠকেরা যার স্বাদ আদৌ পাননি। রবীন্দ্রনাথ এভাবে এক দশকের কম সময়ের মধ্যে পশ্চিম আকাশ থেকে ঝরে পড়েন।

উইলিয়াম রাদিচের প্রধান কৃতিত্ব এই যে তিনি বিচিত্র আঙ্গিক এবং নানা স্বাদের মাত্র ৪৮টি কবিতার কাব্যানুবাদ করেন ‘আধুনিক’ ইংরেজিতে এবং সেই অনূদিত কবিতা দিয়ে এমন একটি সংকলন প্রকাশ করেন, যা রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে ইংরেজ পাঠকদের কৌতূহল নতুন করে জাগিয়ে তোলে। এতে ‘দুই বিঘা জমি’র মতো আখ্যানমূলক কবিতা যেমন ছিল, তেমনি ‘সোনারতরী’, ‘সাজাহান’ এবং শেষ দিকের গদ্যকবিতাও ছিল। বিশেষ করে ব্রিটেনে তখন দ্য রাজ কোয়ার্টেট উপন্যাসগুচ্ছ এবং তার ওপর ভিত্তি করে রচিত টিভির একটি ধারাবাহিক অনুষ্ঠান ‘দ্য জুয়েল ইন দ্য ক্রাউন’, একাধিক নামকরা চলচ্চিত্র গান্ধী, আ প্যাসিজ টু ইন্ডিয়া ইত্যাদি ফেলে আসা ভারতবর্ষ সম্পর্কে ব্রিটেনে যে নস্টালজিয়া জেগে উঠেছিল, তা-ও রবীন্দ্রনাথের পুনর্জাগরণে সহায়তা করে। সেই সঙ্গে অনুবাদক হিসেবে রাদিচেও পরিচিতি লাভ করেন।

রাদিচের এই অনুবাদগ্রন্থটি আকারে ছিল ছোট, কিন্তু অনুবাদের মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চায় এর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। এ গ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার পর ইংরেজ কবি ও সম্পাদক ক্যাথলিন রেইন এর সমীক্ষা করতে গিয়ে লিখেছিলেন যে রবীন্দ্রনাথ যে এত বড় কবি ছিলেন, তা তিনি এ গ্রন্থ পড়ার আগে জানতেন না। এখন তিনি অনুভব করছেন যে বিশ শতকের দুই শ্রেষ্ঠ কবি ছিলেন উইলিয়াম ইয়েটস আর রবীন্দ্রনাথ। এই একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত থেকেই বোঝা যায়, রাদিচের চটি বইটি রবীন্দ্রনাথকে কেমন নতুন জীবন দান করেছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এ বইয়ের ভূমিকাটি রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর সাহিত্য সম্পর্কে পাঠকদের একটা সংক্ষিপ্ত কিন্তু অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ ধারণা দেয়।

একবার এই নির্বাচিত কবিতাসংকলনের মাধ্যমে সাফল্য লাভ করার পর রাদিচে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের অনুবাদে হাত দেন। কবিতার রস আস্বাদনে যেমন তার পরিবেশ সম্পর্কে পরিচিতি একান্ত আবশ্যিক নয়, ছোটগল্প সম্পর্কে সে কথা খাটে না। ছোটগল্পের স্বাদ পেতে হলে সেই জগৎ সম্পর্কে একটা মোটামুটি ধারণার দরকার হয়। সে জন্য ১৯৯১ সালে যখন রবীন্দ্রনাথের নির্বাচিত গল্পের অনুবাদ পেঙ্গুইন থেকে প্রকাশিত হয়, তখন তা কবিতার মতো অতটা সমাদর লাভ করেনি। তবে এ বইয়ের পরিমার্জিত সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৯৪ সালে। কেবল তা-ই নয়, এরপর ছোটগল্পের আরও একটি সংকলন প্রকাশ করেন কাবুলিওয়ালা নামে। তবে রাদিচে উপলব্ধি করেন যে রবীন্দ্রনাথের সত্যিকার অনুবাদের ক্ষেত্র তাঁর গল্প, উপন্যাস অথবা নাটক নয়, সে হলো তাঁর কবিতা। তাই তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতার আরও একাধিক সংকলন প্রকাশ করেন। এমনকি কণিকা, লেখন এবং স্ফুলিঙ্গর ক্ষুদ্র কবিতাও অনুবাদ করেন (২০০৪)।

তিনি সোয়াস থেকে বাংলা শেখার কোর্স শেষ করে ১৯৮০-এর দশকের গোড়ার দিকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করতে আরম্ভ করেন। তাঁর গবেষণার নির্দেশক ছিলেন ঐতিহাসিক অধ্যাপক তপন রায়চৌধুরী। আমি কখনো রাদিচেকে সরাসরি জিজ্ঞেস করিনি, কিন্তু অক্সফোর্ডে তিনি পড়তেন খুব সম্ভব খণ্ডকালীন ছাত্র হিসেবে। বাকি সময় পড়াতেন একটা স্কুলে। পরে তিনি সোয়াসের শিক্ষক হন (১৯৮৮) প্রথমে খণ্ডকালীন প্রভাষক হিসেবে, তারপর প্রভাষক এবং সবশেষে সিনিয়র লেকচারার হিসেবে। তিনি তখন ১৯৯৯ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত বিভাগীয় প্রধান হিসেবেও কাজ করেন। এ সময়ে তাঁর বয়স মাত্র ৫০ বছর। কিন্তু তখনই তিনি অবসর নিয়ে নিজের কাজে আত্মনিয়োগ করতে চান।

রাদিচের পরিচয় শিক্ষক হিসেবে যতটা, তার চেয়ে তিনি ঢের বেশি পরিচিত কবি, লেখক এবং অনুবাদক হিসেবে। তাঁর নয়টি মৌলিক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে এবং কবি হিসেবে তিনি পুরস্কারও লাভ করেছেন। তা সত্ত্বেও তাঁর খ্যাতি এসেছে অনুবাদের পথ ধরে। তিনি অসামান্য অনুবাদক। তাঁর অনুবাদ সঠিক হওয়া সত্ত্বেও সৌভাগ্যক্রমে তা আক্ষরিক নয়। তিনি এক ভাষার ধারণা এবং ভাবটি অনায়াসে অন্য ভাষায় সঞ্চারিত করে দেন। সে জন্য কোনো কোনো বাঙালি সমালোচক বাংলা কোনো শব্দ, অণুবাক্য অথবা বাক্য তুলে ধরে তার সঙ্গে ইংরেজির তুলনা করে তাঁর অনুবাদে আক্ষরিক অমিল দেখিয়েছেন। এ কেবল তাঁর অনুবাদের প্রতি অবিচার নয়, সামগ্রিকভাবে উত্তম অনুবাদের প্রতিই অবিচার। আমার ধারণা, কবি অথবা শিক্ষকের চেয়েও অনুবাদক হিসেবে রাদিচে শ্রেষ্ঠ।’’

এছাড়া উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ‘টুনটুনির বই’ অনুবাদ বইয়ের নাম দেন ‘দ্য স্টুপিড টাইগার অ্যান্ড আদার টেলস। ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ গবেষণা করে তিনি সেটা ভাষান্তর করে নামকরণ করেন ‘দ্য পোয়েম অব দ্য কিলিং অব মেঘনাদ’।

আরও পড়ুন