প্রিয় সতিতলা গ্রাম, যেখানে আমার প্রশান্তি মিলে

আমার বেড়ে ওঠা ‘সতিতলা’ গ্রামে। তাই স্বভাবগত কারণে, তার পাশাপাশি কিছু বৈশিষ্ট্যের জন্য এটিই আমার প্রিয় গ্রাম।

রংপুর বিভাগের প্রবেশদ্বার ১৩ নং কামারদহ ইউনিয়ন পরিষদ । লোকমুখে জানা যায়, এখানে অনেক কামারের বসতী ছিল এবং এই ইউনিয়নে অনেক গর্ত বা দহ ছিল বলে এর নামকরণ করা হয় কামারদহ। ইউনিয়ন পরিষদটি ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এটি গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার অন্যতম একটি ইউনিয়ন। এর মৌজা-১৮ টি। এই ইউনিয়নেরই একটি প্রসিদ্ধ গ্রাম “সতিতলা”।

সতিতলা গ্রামের পূর্বদিকে কোচাশহর ইউনিয়ন, পশ্চিমে করতোয়া নদী, উত্তরে গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভা এবং দক্ষিণে বগুড়া জেলা দ্বারা বেষ্টিত। এটি নিতান্তই নিরিবিলি একটি গ্রাম। ধারণা করা হয়, সতি নারীর ন্যায় বৈশিষ্ট্যের প্রেক্ষিতে, এর নাম ‘সতিতলা’ রাখা হয়। তবে প্রকৃত ইতিহাস জানা যায় নি। এটি গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা হতে প্রায় ৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। এটি ভাগগোপাল মৌজার অন্তর্গত। মৌজার গ্রামগুলোর তুলনায় এর আয়তন অনেক বড় এবং  গ্রামের পরিবেশও সমুন্নত।

 

‘সতিতলা’ গ্রামের বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য— সতিতলা প্রাইমারি স্কুল, সতিতলা ভাগগোপাল কমিউনিটি ক্লিনিক, সতিতলা জামে মসজিদ

প্রায় ১০,০০০ পরিবারের বাস এই গ্রামে। এখানে আবাদি জমির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ-ই কৃষিকাজ করে। তবে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অন্যান্য পেশার দিকেও ঝুঁকছে মানুষ। গ্রামের মহিলারাও এখন বেশ এগিয়ে। গবাদি পশু পালন, শীতবস্ত্র বুনন, বিভিন্ন কুটিরশিল্প তৈরি করে অনেক নারীরা সাবলম্বী হচ্ছে এখন। গ্রামের প্রতিটা মানুষের আত্মীয়তাও উল্লেখ করার মতো।

পাশাপাশি সতিতলা গ্রামের শিক্ষার হারও অনেক বেশি। গ্রামের কৃতি সন্তানরা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে; কেউ মেয়রপদে, কেউ পাইলট হয়ে, কেউবা সাংবাদিকতায় প্রতিনিয়ত নৈপুণ্যতা দেখিয়ে চলেছেন।

পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে শোনা, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ছোড়া, কামানের  গোলা বর্ষণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মাটির নিচে গর্ত করে, গুপ্ত বাসস্থান বানিয়েছিলেন তারা। সেখানেই মাসের পর মাস কাটিয়েছেন। এছাড়া গ্রামের দুইজন মুক্তিযোদ্ধা আছেন।তাঁর হলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা বদের আলী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা জাহাঙ্গীর আলম। তাঁর  মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে বীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন। তারা প্রত্যেকেই আমাদের গ্রামের গর্ব,আমাদের বীর। তাঁদের অবদান প্রজন্মের পর প্রজন্ম মনে রাখবে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এখানকার মানুষজন অনেকভাবে মুক্তিযুদ্ধে করেন।

মনে পড়ে সেই দিনগুলো, যখন গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। রাতের বেলা উঠানে বসে চাঁদের আলো উপভোগ করতাম, সব ভাইবোন মিলে। ধান কাটার সময়গুলোতে উঠান ভরে যেত, ধান আর জোনাকিপোকায়। আমরা ছুটতাম সেগুলোর পেছনে পেছনে। বর্ষায় পুকুরে নেমে বৃষ্টি উপভোগে যেন আলাদা মজা ছিল।

আমার দাদাবাড়ি- নানাবাড়ি দুটোই এই গ্রামে। যার ফলে,আমার জীবনের বেশিরভাগ সময়ই এখানে কাটানো। মনে পড়ে সেই দিনগুলো, যখন গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। রাতের বেলা উঠানে বসে চাঁদের আলো উপভোগ করতাম, সব ভাইবোন মিলে। ধান কাটার সময়গুলোতে উঠান ভরে যেত, ধান আর জোনাকিপোকায়। আমরা ছুটতাম সেগুলোর পেছনে পেছনে। বর্ষায় পুকুরে নেমে বৃষ্টি উপভোগে যেন আলাদা মজা ছিল। আজও মনে পড়ে,সেই দিনগুলোর কথা। দাদি ,বড়মা তালপাখা দিয়ে বাতাস করত আর গল্প করত। তাদের কোলে শুয়ে গল্প শুনে সময় কাটাতাম। কতই না সুখময়, আনন্দমাখা দিন ছিল তখন।

আর নেই সেই দিনগুলো। তবে সতিতলার যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন পূর্বের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে। বিভিন্ন যানবাহন থেকে শুরু করে, রাস্তাঘাট, মানুষের চলাফেরা সবকিছুই আগের থেকে উন্নত। সব মিলিয়ে  ‘সতিতলা’ গ্রামে ঘুরতে আসলে, গ্রামের নির্মল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং এখানকার মানুষের আতিথিয়েতা এক নিমিষেই মন কাড়বে সবার।

লেখক : নূরানী ইসলাম নিসা, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া। মেইল: nuranibogura@gmail.com

‘আমার প্রিয় গ্রাম’ নিয়ে লিখুনআপনি আপনার প্রিয় গ্রামকে নিয়ে আমাদের কাছে লিখুন। সঙ্গে পাঠাবেন গ্রামের একাধিক ছবি ও আপনার পরিচতি। সর্বনিম্ম ৩০০ শব্দে লিখে ফেলুন আপনার গ্রামের যা যা আছে, বেড়ে ওঠা, গ্রামকে নিয়ে স্মৃতি, স্বপ্ন, গ্রামে মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, ইতিহাস-ঐতিহ্য স্থাপনাসহ নানা বিষয়— এই সব নিয়ে  চটজলদি লিখে আমাদের ইমেইল করুন। ইমেইল : boicharita@gmail.com

আরও পড়ুন