ভাসানীর রাজনীতি: বৈচিত্র ও বৈপরীত্যের বিষমযাত্রা

মুহুর্মুহু স্লোগান গান শোনা যাচ্ছিল: ‘যুগ যুগ জিয়ো তুমি, মওলানা ভাসানী’। এবং আরও নানা স্লোগান। বছর দুই আগে টাঙ্গাইলের সন্তোষে যাওয়ার পথে কর্মীবোঝাই বাসেও এরকম বহু স্লোগান শোনা গেছে, বিশেষ করে ‘কৃষকের নয়নমনি: মওলানা ভাসানী’, যা হয়তো একমাত্র ভাসানীর বেলায়ই খাটে।
এবার মওলানা ভাসানীকে নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন বেশ সরগরম হয়ে উঠেছিলো তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে। পাকিস্তানী রাজনীতিতে ভাসানীর আবির্ভাব ছিল যেমন আকস্মিক তেমনি বিস্ময়েরও। বিভাগপূর্ব সময়ের এদেশীয় রাজনীতিতে ভাসানীর নাম মোটামুটি অচেনাই ছিল। আসামে নানা কাজের কাজী ভাসানী হঠাৎ করেই পূর্ববাংলায় এলেন, দেখলেন এবং অতিদ্রুত জনসাধারণের একাংশের মন জয় করে নিলেন। এরপর থেকে রাজনীতিতে ভাসানীর নিরবচ্ছিন্ন লড়াইয়ের কথা আমাদের অজানা নয়। সেই লড়াইয়ের চেহারা ও চরিত্র নানা রঙের। কর্মপ্রাণ মওলানা, ‘ফায়ার ঈটার মুলানা’ ‘ঘেরাও আর জ্বালাও-পোড়াও’-এর উদগাতা ভাসানী, রাজপথে চুয়াল্লিশ ধারা ভাঙার সাহসী নেতা ভাসানী, সন্তোষে চালাঘরের একান্তে বসে রাজনীতির জাদুকাঠি চালানোয় সিদ্ধহস্ত ভাসানী- ইত্যাদি নানারূপে ভাসানীকে আমরা দেখেছি।
মাঝেমধ্যে আমার মনে হয় আমাদের রাজনীতিতে ভাসানীর মতো বর্ণাঢ্য ও রহস্যময় ব্যক্তিত্ব আর দ্বিতীয়টি নেই। রাজনৈতিক চরিত্রের নানা বিচিত্র পার্শ্বমুখ নিয়ে তৈরি ভাসানীর ব্যক্তিত্ব। তাই লোকে তাঁকে অনেক সময় ভুল বুঝেছে; তবে সাধারণ মানুষ নয়, ভুল বুঝেছে রাজনৈতিক অঙ্গনের নানা ধারা উপধারার অনুসারীগণ। রাজনীতির বিচিত্র ও বিভিন্ন ধাতুতে গড়া এই মানুষটিকে বুঝে নেওয়ার কাজ বড় একটা সহজ ছিল না।

ব্যক্তিগতভাবে রাজনৈতিক কারণে তাঁর কাছাকাছি এসেছিলাম ছাত্র বয়সে, সেই বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের সময়। বার লাইব্রেরি হলে বাহান্ন সালের ৩১ জানুয়ারি সর্বদলীয় বৈঠকের সভাপতি, তেল চুকচুকে বেতের টুপি পরা ভাসানীর ধাতব কঠিন, দৃঢ় শব্দাবলীর সভাপতি-ভাষণে অবাক হয়েছি, চেহারা ও বক্তব্যে তাঁকে মেলানো কষ্টকর ছিল। এরপর তাঁর অফিসে একাধিক বৈঠকের পর দিব্যি একুশে ফেব্রুয়ারি সামনে রেখে তাঁর কৃষক-অঞ্চলে সফরে যাওয়া আমাদের অনেকেরই ক্ষোভের কারণ হয়ে উঠেছিল। মনে হয়েছিলো মওলানার এই সফর ভাষা আন্দোলনের প্রতি তাঁর অবহেলারই প্রকাশ। কথাটা সেসময়েই মাথায় এসেছিল।
ভাসানী অনুসারীগণ যে-যাই বলুন, যে-যুক্তিই দেখান, ছাত্রদের রাজনৈতিক দৃঢ়তা বুঝে নেওয়ার জন্যে তিনি সে সময় ঢাকায় অনুপস্থিত ছিলেন ইত্যাদি গূঢ় কারণ যা কিছুই বলা হোক না কেন, এতকাল পর এখনো আমার ধারণা, বিশ ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভায় আবুল হাশিমের বদলে ভাসানীর হাল ধরার তাৎপর্যই হত সম্পূর্ণ ভিন্ন। সংগ্রাম পরিষদকে পিছু হঠার নীতি গ্রহণের কলংক বরণ করতে হতো না, আন্দোলন বহুগুণ জোরদার হতে পারতো। তাছাড়াও ১৪৪ ধারা ভাঙার প্রশ্নে এত দ্বিধা, এত সংশয়, এত ভিন্নমতের অবকাশ তৈরি হত না। আমার বিশ্বাস, সে রাতে ভাসানীর অনপুস্থিতি ছাত্রসমাজের আকাঙ্ক্ষিত সমাপন অনেকাংশে ব্যাহত করেছে।

মওলানা ভাসানীকে আরও কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিলো চুয়ান্ন সালের নির্বাচনী কর্মকাণ্ডের সময়। যুক্তফ্রন্টের তিন প্রধানের মুখ তখন তিন দিকে ফেরানো। ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থের চিন্তায় আচ্ছন্ন হক সাহেব (এ. কে. ফজলুল হক), মার্কিনী গণতন্ত্রের অন্ধ অনুসারী সোহরাওয়ার্দী সাহেব, আর সাম্রাজ্যবাদ- সামন্তবাদবিরোধী প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রতীক মওলানা ভাসানী- এই তিন তিনটি স্তম্ভের মিলে যেন এক বিষমকোণী রাজনৈতিক ত্রিভুজ তৈরি হয়েছিল।
সত্যই ভাসানীর রাজনীতি বুঝে-ওঠা মোটেই সহজ ছিল না। নানা দুর্বোধ্য ও বিরোধী উপাদানে জটিল ছিল তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও পদক্ষেপ। ধর্মপ্রাণ মওলানা, অসংখ্য মুরিদের ভক্তিভাজন মওলানা পূর্ববাংলার কমুনিষ্ট পার্টিকে যুক্তফ্রন্টের শরিক দল হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কী লড়াইটাই না চালালেন, যে কারণে নিজদলে তাঁর অবস্থান হয়ে উঠেছিলো দুর্বল। এই মওলানাই ফ্রন্টে নেজামে ইসলামের অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে কড়া বাচন ঝাড়তে এতটুকু দ্বিধা করেননি। নির্বাচন-প্রার্থীদের নাম মনোনয়ন বামপন্থী ও প্রগতিশীলদের টেনে আনার চেষ্টায় ব্যর্থ ভাসানীর ক্ষুব্ধ প্রতিবাদী ভূমিকা অন্যদের পক্ষে অপ্রিয় হলেও আমাদের জন্যে কিছুটা বিস্ময় এবং সান্ত্বনার কারণ হয়ে উঠেছিল।
অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছি, কারকুন বাড়ি লেনে ইয়ার মোহাম্মদ খানের বাড়িতে বসে সে সময় প্রগতিশীল ও বাম কর্মীদের দিয়ে মওলানার কর্মীশিবির গড়ে তোলার অতি বিচক্ষণ ও দূরদর্শী প্রয়াস কী অর্বাচীন ভ্রান্তিতে তৎকালীন কমুনিষ্ট পার্টি বন্ধ করে দিয়েছিল, যে ভুলের মাশুল তারা নানাভাবে দিয়েছে; ‘জাম খেতে না পেরেও মার খেয়েছে বিস্তর।’ ভাসানীর এই চেষ্টার রাজনৈতিক তাৎপর্য অদূরদর্শী পার্টি একেবারেই বুঝতে পারেনি, ভেবেছে এতে করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভেবে দেখেনি যে, ভাসানী নিজেই তখন আওয়ামী লীগের সভাপতি। এখানেও কম্যুনিষ্ট পার্টি মওলানাকে বুঝাতে পারেনি, তাঁকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে পারেনি।
এক দিকে জঙ্গী কৃষক-জনতা অন্যদিকে ছাত্র-যুবসমাজ ছিল ভাসানীর রাজনৈতিক শক্তির উৎসবিন্দু। এদের উপর তাঁর নির্ভরশীলতা ছিল যথেষ্ট। তার নানা কথায় ও মন্তব্যে, এমনকি আলাপচারিতায় এই আস্থার প্রমাণ মেলে। মনে আছে, যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের পর তিন প্রধানকে আমরা নৈশভোজে আপ্যায়িত করেছিলাম, অবশ্য তিনজনকে একসাথে নয়, আলাদাভাবে, ভিন্ন ভিন্ন দিনে। এই ঘটনা থেকে আজকের পাঠক একই ফন্টের অন্তর্ভুক্ত তিন প্রধানের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং তাঁদের রাজনৈতিক চরিত্রের পরিচয় পেতে পারেন।

একই আমন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছিল মেডিকেল কলেজের বাম ছাত্র গ্রুপ, যদিও আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণের দায়িত্ব ছিল কলেজ ইউনিয়নের উপর আর তাতে ছিল রাজনীতিসচেতন ছাত্রদের আগ্রহ। বেশ কিছুসংখ্যক মেডিকেল ছাত্র সেই নির্বাচনে এবং সংশ্লিষ্ট কাজে এমনকি মন্ত্রীসভা গঠন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। সেসব আজ ইতিহাস।
সে যাই হোক, রাত আটটা সাড়ে আটটার দিকে খাওয়া দাওয়ার পর হোটেল কমনরুমের সামনে বেশ খোশ মেজাজে বসেছিলেন সোহরাওয়ার্দী সাহেব। তাঁকে ঘিরে পঁচিশ-ত্রিশজন ছাত্র। একটু পর পর ছাত্রদের কন্ঠে স্লোগান। কিছুটা বিরক্ত হয়েই শহীদ সাহেব তাঁর ভাঙা বাংলায় বলে উঠলেন: আর স্লোগান তো অনেক হলো। এখন তোমাদের কাজ পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া।
নেতার বিরক্তি ছাত্রদের দমাতে পারেনি। বরং মার্কিন বিরোধী শ্লোগানের অবকাশে নেতাকে প্রশ্ন করা হয়েছে, তাঁরা ক্ষমতায় গেলে পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তির প্রশ্নে তাঁরা কী ধরনের নীতি গ্রহণ করবেন। ‘সেটা এখনও ভেবে দেখিনি’ গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দেন নেতা। এরপর হঠাৎ করে উঠে পড়েন রাত বেড়ে যাওয়ার অজুহাতে। কিন্তু ভাসানী ছিলেন ভিন্ন ধাতুতে গড়া রাজনীতিক। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ছাত্রদের ব্যবহার করে পরে তাদের পাঠে মনোযোগ দেবার সদুপদেশ বিতরণের ধাত তাঁর ছিল না। অবশ্য ক্ষমতাসীন রাজনীতিকদের কণ্ঠে এমন বাণী তখনও শুনেছি, এখনো শুনি, খবরের কাগজে পড়ি। কিন্তু ভাসানীর মুখে কখনো শুনিনি। খেতে ভালোবাসতেন মওলানা, অনেকটা অই হক সাহেবের মতই, সোহ্রাওয়ার্দী সাহেব অবশ্য তুলনায় যথেষ্ঠ মিতাহারের নজির রাখলেন। সেকালে আমাদের হস্টেলের গ্র্যান্ড ফিষ্ট- ছাত্রমহলে খুবই সুনাম রেখেছিলেন মাথাপিছু আস্ত মুরগির রোষ্ট থেকে আদি মরণচাঁদের সুস্বাদু দই ও প্রাণহরা, মাছ আর ফল- সব মিলিয়ে এক এলাহী কাণ্ড। বেশ তৃপ্তির সঙ্গে খেলেন এবং ভালোই খেলেন মওলানা। তারপর আসনপিঁড়ি হয়ে জাঁকিয়ে চৌকিতে বসে একের পর এক সব প্রশ্নেরই জবাব দিয়েছিলেনস্বভাবসুলভ তির্যক ভাষায়। চুপসে দিলেন পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তির বেলুনটিকে তীক্ষ মন্তব্যের খোঁচায়। কথার পর কথায় সাম্রাজ্যবাদের চাতুরিকে কফিনে ঢুকিয়ে দিলেন। ছাত্রদের সংগ্রামী ভূমিকার প্রশংসা করে পাঁচমিশালী ফ্রন্টের সাফল্য সম্পর্কে সরাসরি তাঁর সংশয়ের কথা জানিয়ে দিলেন। বললেন, এ বিজয় তোমাদের আর তোমাদেরই তা রক্ষা করতে হবে। সব শেষে বিদায় নেবার আগে কয়েকটি ভয়ংকর বাক্য উচ্চারণ করে গেলেন: গদীলোভী নেতাদের চামড়া খুলে দিলে ছাত্রদের ঋণ শোধ হবে না। তাদের সিধা রাখার দায়িত্ব ছাত্রদেরই।
আজও অবাক হয়ে ভাবি: কী দুস্তর ব্যবধান অই দুই নেতার চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে। এরা কি কখনো এক মঞ্চে মিলতে পারেন? অই অমিলের দরুণ এঁরা রাজনীতির দুই বিপরীত মেরুতে অবস্থান নিলেন। একজন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কট্টর সমর্থক, অন্যজন তেমনি বিরোধী। একজন সমাজতন্ত্র-বিরোধী গণতন্ত্রী, অন্যজন জাতীয়তাবাদী হয়েও সমাজতন্ত্রী।
আমার মনে হয়, নানা কারণের প্রভাবে ভাসানীর রাজনৈতিক চেতনায় এমন একাধিক বিরোধী উপদানের সমন্বয় ঘটেছিল যা একাধারে মেলানো কঠিন। তবু তিনি সেগুলোকে মেলাতে চেষ্টা করেছেন। হতে পারে, আসামে মেহনতি মানুষের স্বার্থ নিয়ে কাজ করার আকর্ষণ তাঁকে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির রাজনীতির উদ্বুদ্ধ করে যা তাঁর ধর্মবোধের পক্ষে বাধা হয়ে উঠেনি। এই চেতনা তাঁকে সামন্তবাদী শোষণের শিকার কৃষকের আঙ্গিনায় পৌঁছে দিয়েছিল। আর শোষিত মানুষের মুক্তির রাজনীতিই সম্ভবতঃ তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনার অন্যতম কারণ। শোষণের যে কোনো ধর্ম নেই এই সহজ সত্য তাঁর বুঝতে কষ্ট হয়নি। এবং সেজন্যই দৃঢ়কণ্ঠে বলতে পেরেছেন, ইতিহাসের নায়ক হচ্ছে বঞ্চিত, লাঞ্ছিত মানুষ।
কিন্তু ভাসানীর রাজনীতির বড়ো বিষয় হলো, তাঁর মতো অল্পশিক্ষিত মওলানার পক্ষে, গ্রামীণ মানুষের অসংখ্য ভক্ত অনুসারীর সঙ্গে সহাবস্থান। শুধু সহাবস্থানই নয়, স্বেচ্ছাচারী লীগ শাসনের অন্ধকার যুগে বামপন্থীদের সঙ্গে পরস্পর নির্ভর সহযোগিতা, যা এদেশে প্রগতিশীল বিরোধী রাজনীতির পক্ষে বলিষ্ঠ ধারা সৃষ্টি করেছিলো। ভাসানী এবং বামপন্থীগণ ছিলেন প্রগতিবাদী রাজনীতির অগ্রযাত্রায় সফল রাজনীতির সোনালী দিনগুলো এই পরস্পর নির্ভরতার ফসল। অথচ তাদের মধ্যে বিরোধও কম ছিল না, আর এই বিরোধ বাম রাজনীতির যত ক্ষতি করেছে অন্য কোনো কারণ তা পারেনি।
বিরোধী উপাদানের সঙ্গে তাঁর এই বোঝাপাড়ার কারণেই একদিকে যেমন মওলানাকে দেখা গেছে বিশ্বাসী ভক্তদের অকাতরে দোয়াবর্ষণ করতে, তাবিজ-কবজ দিতে এবং রাজপথের রাজনৈতিক হাঙ্গামা এড়ানোর উদ্দেশ্যে বা পথে প্রান্তরে কৌশলগত কারণে জায়নামাজ বিছিয়ে অসময়ে হলেও নামাজে বসে যেতে, তেমনি দেখা গেছে অনুরূপ আন্তরিকতায় হাঙ্গামা নির্যাতনের শিকার বামপন্থী নেতাকর্মীদের দিকে বরাবরই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে।
এসব বিষয়ে ভাসানীর তুলনা ভাসানী নিজেই। একমাত্র তাঁর পক্ষেই সম্ভব ছিল মুসলিম লীগ সরকারের পাশবিক নির্যাতনের শিকার নাচোলের কমুনিষ্ট নেত্রী ইলা মিত্রকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে উপস্থিত চিকিৎসক জনতার সামনে নিজের মেয়ে বলে ঘোষণা দেওয়া এবং মরণাপন্ন নেত্রীর সুচিকিৎসার অভিভাবকত্ব স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নেওয়া। এমন বহু ঘটনার সাক্ষী তৎকালীন মার্কসবাদী নেতা-কর্মীদের অনেকেই। স্বভাবতই এই ভাসানী পেরেছিলেন চীনের জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রতি প্রাণঢালা সমর্থন জানাতে এবং বিপ্লবের অন্যতম নায়ক মাওসেতুং-এর সঙ্গে রাজনৈতিক একাত্মতা ঘোষণা করতে এমনকি একথাও বলতেন যে, ‘সাধারণ মানুষের ঐতিহাসিক ভূমিকায় চীন যে সহায়তার হাত প্রসারিত করেছে তা তাকে আগামী দিনের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মর্যাদা দান করবে।’
এদেশের বামপন্থী আন্দোলনের ভালোমন্দের একদা সঙ্গী মওলানা ভাসানী জীবনের শেষদিকে তাঁর রাজনীতিকে যে ভক্তিবাদের প্রাঙ্গনে টেনে আনেন তার কারণও খুব একটা দুর্বোধ্য নয়। হক্কুল এবাদ এবং হুকুমতে রাবানিয়া তথা রবুবিয়াত-এর মাধ্যমে ভাসানী তাঁর রাজনৈতিক হতাশা নিরসনের পথ খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন। আল্লার নামে রাষ্ট্রের সব সম্পদ প্রয়োজন অনুসারে সমানুপাতিক বণ্টনের মাধ্যমে ব্যক্তিমালিকানার উচ্ছেদ ছিল তাঁর রবুবিয়াত-এর লক্ষ্য। তাঁর ভাষায় ‘ইহার সাথে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের কোনো সম্পর্ক নাই। সকল ধর্মাবলম্বী উহার উপকারিতা ভোগ করিতে পারিবে।’ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের আদর্শ সম্পর্কে নির্দেশ দিলেন যাতে তারা হতে পারে আবুজর গিফারীর মতো প্রতিবাদী, হজরত আলীর ন্যায় জ্ঞানপিপাসু, সালাউদ্দীনের মতো বীর এবং ক্ষেত্র বিশেষে মাও সে-তুঙের অনুসারী। এখানেও সেই অদ্ভুত বিষম সমন্বয়, এমনকি নতুন পথে এসেও।
কিন্তু কেন এই ব্যতিক্রমী যাত্রা? এর কারণ কি রাজনৈতিক নিঃসঙ্গতা, বিশেষ করে বামপন্থীদের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতার পরিপ্রেক্ষিতে এবং বিশেষ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ব্যর্থতা, বিষয়টি গবেষণার ও বিশদ পর্যালোচনার।

তবে একথা ঠিক যে, এমনি করে ভাসানী তাঁর রাজনৈতিক সত্ত্বায় দুই বিপরীত চেতনার সংমিশ্রণ ঘটানোর কারণে একদিকে যেমন দুর্গম চড়াই-উৎরাই পার হওয়ার কষ্ট স্বীকার করেছেন, তেমনি আবার যথেষ্ট বিচক্ষণতা ও প্রজ্ঞা সত্ত্বেও রাজনৈতিক সাফল্যের সঞ্চয় তুলনামূলক বিচারে কমই গড়তে পেরেছেন। অবশ্য এই সত্যও অনস্বীকার্য যে, একমাত্র তাঁর উপস্থিতিই এদেশে প্রগতি রাজনীতির বাধাটিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে, এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। বিরোধী রাজনীতির সুষ্ঠু ও বলিষ্ঠ বিকাশ যদি গণতন্ত্রচর্চার অন্যতম পূর্বশর্ত হয়ে থাকে তাহলে স্বীকার করতেই হয়, ভাসানী এদেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠার এবং চর্চার অন্যতম পথিকৃত। আবার একথাও সত্য যে, মার্কসবাদের তত্ত্বে বিশ্বাসী না হওয়া সত্ত্বেও বিত্তহীন শোষিত মানুষের রাজনীতির প্রতিষ্ঠার সহায়তায় তার ভূমিকা অনন্য।
এই ভূমিকা যেমন তাঁর রাজনীতির চমকপ্রদ দিক তেমনি কখনো কখনো বিপত্তির কারণ। দেশাত্মবোধক জাতীয়তাবাদী আর সমাজবাদ এই দুইয়ের মিল ঘটাতে গিয়েই মনে হয় বারবার বিপত্তির সম্মুখীন হয়েছেন ভাসানী। তাঁর রাজনৈতিক সমাপনে যদি ব্যর্থতার প্রকাশ ঘটে থাকে তাহলে তারও উৎস সম্ভবত এই বিষমযাত্রা। যে সাম্রাজ্যবাদ সামন্তবাদবিরোধী জাতীয়তাবাদী চেতনা নিয়ে তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা শুরু, সেই পথের সুষ্ঠু অনুসরণই বোধ হয় তাঁকে সর্বোত্তম রাজনৈতিক সাফল্য এনে দিতে পারত, কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। এখানেই ভাসানীর রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা। আর এই ব্যর্থতার দায়ভাগে মার্কসবাদীদের ভূমিকাও খুব ছোট নয় বরং সিংহভাগ বলেই মনে করি।
আহমদ রফিক : ভাষাসংগ্রামী, কবি, বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক, রবীন্দ্র-গবেষক।
