বুলবুল: বিদ্রোহীর বুকে বিষাদের সুর —বেদনাতুর পিতার হাহাকার এবং একমুঠো উজ্জ্বল স্মৃতি

বইপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আলোচ্য বিষয় কাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর রচনা ও জীবনী। প্রতিটি নক্ষত্রের জীবনে একইসঙ্গে উজ্জ্বল এবং অন্ধকার দিক থাকে। কাজী নজরুলের নির্ভীক এবং দুঃসাহসী ক্রিয়াকলাপের মধ্যে অন্যতম বেদনার মুহূর্ত তাঁর সন্তান বিয়োগ। এহেন বিদ্রোহী কবিও যে সাধারণ মানুষ, একজন পিতা, তা আমরা হয়তো ভুলেই যাই। বাস্তব কিন্তু অন্য কথা বলে। মনীষীদের জীবনেও যে নেমে আসে হাহাকার, অশ্রুর স্রোত! তার মধ্যেও সৃষ্টিশীলতার ফল্গুধারা আপন রূপ-রসে প্রবাহিত হয়।
সমগ্র বইপ্রেমী তথা গ্রন্থকীটদের জন্য সুখবর! সম্প্রতি ছায়ানট (কোলকাতা) – এর উদ্যোগে এবং সোমঋতা মল্লিকের সম্পাদনায় প্রকাশিত গ্রন্থ ‘বুলবুল: বিদ্রোহীর বুকে বিষাদের সুর’ — একটি অসাধারণ এবং বিরল তথ্যসমৃদ্ধ বই, যেটি রিসার্চ পাব্‌লিকেশন থেকে সদ্য প্রকাশিত, সহযোগিতায় আল-আমীন মিশন। বইটি এক নিঃশ্বাসে পড়ে অবাক হতে হয়। এভাবেও লেখা যায় গবেষণালব্ধ নীরস তথ্যসমূহ? কবির শোকাতুর জীবনে এত বেদনাই কি তাঁর অফুরন্ত সৃষ্টিশীলতার উৎস? অজানা বহু প্রশ্নে ব্যাকুল পাঠককুলের কৌতূহল নিরসনের জন্য অবশ্যই সংগ্রহ করতে হবে বইটি।

কৃষ্ণনগরের গ্রেস কটেজ — নজরুলের দ্বিতীয় পুত্র বুলবুল ওরফে অরিন্দম খালেদের জন্মস্থান। বুলবুল ছিল অসম্ভব প্রতিভাধর। অসাধারণ স্মৃতিশক্তি নিয়ে জন্মেছিল সে। মাত্র চার বছর বয়সে শুধুমাত্র কানে শুনে অবিকল বলতে পারতো যেকোন বিষয়! ভাবা যায়? ঠিক তেমনই অবিশ্বাস্য মনে হয়, কাজী নজরুলের রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজের অনুবাদ, মুমূর্ষু পুত্রের রোগশয্যার পাশে উপবিষ্ট হয়ে কী অসাধারণ ধৈর্য্য এবং সৃজনশীল মনোভাব নিয়ে সেই দুরূহ কাজ তিনি সম্পন্ন করেছিলেন। সত্যি অবাক লাগে! আরও চমৎকৃত হই, শেষ সময়ে পুত্রের জীবনরক্ষার্থে তিনি এক সাধুর খোঁজ করেছিলেন। এইখানেই আমরা খুঁজে পাই একজন অতি সাধারণ পিতাকে, বিদ্রোহী নজরুলকে নয়, একজন শোকার্ত মানুষকে! ধর্ম এবং বিভেদের সীমারেখা মুছে এই বুঝি এক অতি সাধারণ এবং নগণ্য মানুষের অবনত হওয়া —
সর্বশক্তিমানের পদতলে! বুলবুলের অকাল প্রয়াণের পর ‘বুলবুল’ নামাঙ্কিত গীতিগ্রন্থ তাঁর এক অনন্য সৃষ্টি।

এবারে বইটির কথায় আসি। প্রথম থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত এই বিরল গ্রন্থে রয়েছে কাজী নজরুল ইসলাম এবং বুলবুলকে নিয়ে অসংখ্য স্মৃতিচারণ, লিখিত পত্রসমূহ, রচিত কাব্য — যেগুলি থেকে আমরা খন্ড খন্ড জীবনচিত্র পাই; বহু ঘটনাই স্বল্পশ্রুত। কিছু ভিস্যুয়াল অর্থাৎ বিরল আলোকচিত্র বইটিকে অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে। সব থেকে বড়ো কথা, নজরুলের দ্বিতীয় পুত্র বুলবুল, যার জন্মশতবর্ষে কৃষ্ণনগরের গ্রেস কটেজ (বুলবুলের জন্মস্থান) থেকে এই বইটির প্রকাশ, সোমঋতা এবং ছায়ানট (কোলকাতা)-র আন্তরিক উদ্যোগের কথাই ব্যক্ত করে। সমগ্র কর্মটি অত্যন্ত দুরূহ! সোমঋতা সেই কাজটিই সম্পন্ন করেছেন সুদৃঢ় দক্ষতার সঙ্গে।

একইসঙ্গে ড. শেখ মকবুল ইসলাম লিখিত অংশবিশেষ অবশ্যই উল্লেখযোগ্য — “বুলবুলের মৃত্যু দুঃখজনক। এই প্রসঙ্গে নজরুলের শোকখিন্ন অবস্থার কথা যে পরিমাণে উঠে এসেছে, বুলবুলের গর্ভধারিণী জননী প্রমীলার কথা সেই পরিমাণে উঠে আসেনি। প্রমীলাদেবীও তো সন্তানহারা মা…” অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য, হয়তো সংসারজীবনে নিবিড়ভাবে আবদ্ধ প্রমীলাদেবীর গভীর শোকবার্তা সেভাবে লিপিবদ্ধ হয়নি।

আরও একটি কথা না লিখে পারছি না। কাজী নজরুল যোগ-সাধন সম্পর্কিত একটি পুস্তকের ভূমিকায় লিখেছিলেন — “কিছুদিন পরে আমি যখন পথ খুঁজিতেছি, তখন আমার প্রিয়তম পুত্রটি সেই পথের ইঙ্গিত দেখাইয়া…হারাইয়া গেল। মৃত্যু এই প্রথম আমায় ধর্মরাজ-রূপে দেখা দিলেন।” কি অদ্ভুত উপলব্ধি। ধর্ম যেখানে সমস্ত বাধা-বন্ধনহীন, সেখানেই প্রকৃত সৃষ্টির সুখ; অবিনশ্বরের সুচিন্তা নশ্বর জগতের চিরন্তন বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে উঠে এক আধ্যাত্মিক জগতে প্রবেশ করায়, পাঠককে এক অন্য মাত্রায় উদ্বুদ্ধ করে।

পরিশেষে না বললেই নয়, বহু গুণী মানুষের কলমে বইটির প্রতিটি লাইনে চিত্রিত হয়েছে কাজী নজরুলের গভীর শোক, বুলবুলের জীবন বৃত্তান্ত। একইসঙ্গে উল্লেখ্য ছায়ানট (কোলকাতা) ও সম্পাদিকা সোমঋতা মল্লিকের সুপ্রশংসনীয় পরিকল্পনা ও পরিচালনা। তাঁর সুসম্পাদনায় বেশ কিছু অডিও-ভিস্যুয়াল ইতিমধ্যেই সাড়া ফেলেছে। এবারে আলোড়ন তুলেছে প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থ, প্রথম বই হিসেবে যেটি অতুলনীয়! বইটির ছাপা ও বাঁধাইও বিশেষ প্রশংসার দাবী রাখে।

আরও পড়ুন