‘দূরের বরফদেশ’ কাছে টানে

নর্মদা মিথুনের দূরের বরফদেশ পাঠককে কাছে টানে। কাছে টানে কারণ এখানে গল্প আছে, গভীর অনুভূতির কথা আছে, আর আছে আপ্তবাক্যের মতো কিছু পঙ্‌ক্তি। গল্পগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে কবির নিজের জীবনের গল্প হিসেবে। পাঠক সেই গল্প পড়ে কবির সঙ্গে একাত্ম হন, বিষণ্ন হন—গল্পগুলো পাঠকের নিজের মনে হয়। কিংবা কবিতায় যেসব অনুভূতি কবি মিশিয়ে দিয়েছেন, একান্তই সেগুলো কবির নিজের। তবু পাঠককে সেসব অনুভূতি ছুঁয়ে যায়—অনুভূতির কুয়াশায় নিজেকে জড়িয়ে পাঠকও কিছু সময়ের জন্য কবি হয়ে ওঠেন। আবার কবিতায় উচ্চারিত কিছু কথা কবির জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে বাণীরূপ পেয়েছে। পাঠকের চেতন-অচেতন সেসব পঙ্‌ক্তিতে জলের মতো ঘুরতে থাকে—সেগুলোর কোনোটি কোনো পাঠক কোনোদিন নিজের কথার প্রতিলিপি হিসেবে ব্যবহার করলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

কবিতায় গল্প
একটি কবিতায় সেঁজুতিদির সঙ্গে কবি পরিচয় করিয়ে দেন। পরিচয়ের শুরুটা নাটকীয়। শেষটাও নাটকীয়। তবে সব মিলিয়ে গল্পটি হয়তো খুব অভিনব নয়। তবু পাঠকের কাছে সেঁজুতিদির গল্প শেষ হয়ে যায় না। সেঁজুতিদির জন্য বুকে কষ্ট হয়। পাঠক চাপা কষ্ট নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাসও হয়তো ফেলতে পারেন। তারপর একসময়, অন্য কোনো দিন, নিজের পাশে অন্য সেঁজুতিদিকে আবিষ্কার করতে পারেন।

‘সেঁজুতিদি’ কবিতাটির উপস্থাপনভঙ্গি একেবারে নতুন। এর ভেতরে গল্প আছে। তবে যতই গল্প বলা হোক, শেষ পর্যন্ত এটি কবিতা। আর কবিতা বলেই সেঁজুতিদির গল্পটা শুরু হয় এভাবে:
একদিন শীতের সকালে চিড়ের নাড়ুর সঙ্গে দুধ-চা খেতে
খেতে সেঁজুতিদি বলল, ‘এই, বড় হয়ে কী হতে চাস রে?’
আমি বললাম, ‘কুয়াশা। আকাশ থেকে ধোঁয়ার মতো
বিশালাকার জাল ফেলা কুয়াশা।’

বালক কুয়াশা হতে চায়। আর তাই সেঁজুতিদি কুয়াশা দেখলেই বালকটিকে ডেকে নিয়ে যায়। তারপর দুজনে মুখ দিয়ে বিড়ি ফোঁকার মতো করে ধোঁয়া ছাড়ে। এই মেয়েটি, যাকে কবি দিদি ডাকেন, সে চিরদিনের ভালোলাগার মানুষ হয়ে থাকে কবির কাছে। একদিন সেঁজুতিদি ঢাকা শহরের কোনো গার্মেন্টসে কাজ পায়। তার উচ্ছল আনন্দ দেখে বালক-কবির মনেও ঢাকায় আসার স্বপ্ন জাগে। তার স্বপ্ন অনেক ছোট—ঢাকায় এসে ‘টেলিভিশনের ভেতরে দেখা বড় বড় দালান দেখব।/ কমলাপুর ইস্টিশান দেখব।’ তবু এই ছোট ছোট স্বপ্নগুলোই বালকের কাছে অনেক বড়।

এই গল্পের শেষটা শোনা যাক। … তারপর থেকে সেঁজুতিদি ঢাকায় থাকত। আর মাসে মাসে চিঠি লিখত মায়ের কাছে। কবি ‘চিঠির দেহে ফড়িঙের মতো গিয়ে’ বসতেন, বারবার। এভাবে গল্প বলতে বলতে কবি জানান দিতে থাকেন, এটি কবিতা। আবার কবিতায় শব্দমালা গাঁথতে গাঁথতে তিনি বলতে থাকেন, এটি গল্প। তারপর …
তারপর একদিন মা জানায়, বিয়ে করেছে সেঁজুতিদি।
উত্তরের দেশে তার শ্বশুরবাড়ি। সেখানে ঠান্ডা লাগে নাকি
সুইয়ের ঘায়ের মতো। আর কুয়াশায় ঢেকে রাখে
দূর-বহুদূর।

বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চলে প্রচণ্ড শীত পড়ে। আবার বাংলাদেশের মেয়েদের স্বপ্নগুলো ভাঙতে শুরু করে বিয়ের পর। বাংলাদেশের ভূগোল আর আবহাওয়ার সঙ্গে সেঁজুতিদির দেহ আর মনকে কবি মিলিয়ে দিয়েছেন। তাই ‘সুইয়ের মতো’ ঘা মারা ঠান্ডা শুধু শীতের ঠান্ডা হয়ে থাকে না, সেঁজুতির প্রতিনিয়ত ভাঙার গল্প হয়ে ওঠে। আহা, বালক-কবি শেষ পর্যন্ত একা, বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই বিচ্ছিন্নতা, বেদনাই বালককে কবি করে তোলে।

‘রণধীরের সংসার’, ‘সংসার’, ‘আগরবাতি’ এসব কবিতায়ও গল্প আছে। গল্পগুলো পাঠক দেখতে পান—কবি দেখান বলেই দেখতে পান। সেগুলো কবির সাথে সাথে পাঠকের হৃদয়েও কষ্ট তৈরি করে। কষ্টে হৃদয় মথিত হয়।

অনুভব-অনুভূতি
কবিতার সীমিত শরীরে বিস্তৃত অথচ গভীর ভাব লুকিয়ে থাকে। কবির অনুভব-অনুভূতি জারিত হয়ে কবিতায় পরিণত হয়। কবি ভাষাপ্রয়োগের ও ভাবপ্রকাশের মধ্য দিয়ে নিজের সক্ষমতার জানান দেন। পাঠক কবিতায় কবির অনুভব ও ভাবকে নিজের মতো করে গ্রহণ করে তৃপ্তি লাভ করেন।
যেমন, ‘হেরে যাওয়া’ কবিতায় কবি জানিয়ে দেন, হারার মধ্যেও লাভ আছে। সেটি কবি শিখেছেন নদীর কাছে, এবার পাঠককে শেখান—
জীবনে ভাবিনি নিজে কিসে লাভ আছে
গোপনে শেখাতে নদী ডাকছিল কাছে
শেখাতে শেখাতে বলে, ‘হারটাই ভালো’

এরপর পাঠকও হারার মধ্যে লাভ খুঁজে নিতে পারেন। পাঠকও নদীর মতো স্থির অথচ বহমান হতে পারে। কিন্তু কবির চিত্ত কোনো নির্দিষ্ট ধরনে স্থায়ীভাবে কাঠামো পেতে চায় না। তাই কবিকেও ক্ষুব্ধ হতে দেখা যায়। সংক্ষুব্ধ কবির প্রতিক্রিয়াও তীব্র। এর সঙ্গত কারণও আছ। স্বদেশে যা চলে, তা কবিকে স্থির থাকতে দেয় না। চারদিকের অন্তঃসারশূন্যতা অবলোকন করে তাই নির্দ্বিধায় উচ্চারণ করেন—
বাঁশের বেড়ায় সিমেন্ট প্রলেপ সাঁটি
চোখের সীমায় দেয়ালটি চকচকে
দালান ভেবেই জীবন বানাই মাটি
গণতন্ত্র ফাঁকা ও ফকফকে! (মাটির মাপের মানুষ)

আবার দূর দেশের ঘটনাও খুব অন্যরকম মনে হয় না কবির। স্বদেশী হয়েও কোথায় যেন নিজেকে বড় আলাদা, অপরিচিত মনে হয়—
শোনো, ও জর্জ ফ্লয়েড, আমি বাংলাদেশের নিখিল
বিচারের দরজায় কারা যেন আটকে দিয়েছে খিল।
(‘ফ্লয়েড, নিখিল বলছি’)

উপরের কবিতাটির পরিসর দু লাইন। কিন্তু যা বলার সবটা বলে দিয়েছেন এখানেই। পৃথিবীর সব নাগরিক কখনো নগরকে নিজের করে পায় না। আবার সে নিজেকে সংখ্যালঘুও ভাবতে চায় না। এই বেদনা ‘না নাগরিক, না সংখ্যালঘু’ কবিতায় খুব স্পষ্ট। তবে এই বিভাজন যে শুধু গায়ের রঙের কারণে হয় না, ধর্মের কারণে হয় না, সেটি কবি স্পষ্ট করেন। এর পিছনে যুগ যুগ ধরে বয়ে চলা শ্রেণিবৈষম্যও রয়েছে। তাই ‘টোকাই’ কবিতায় দেখা যায়, টোকাই চিরদিন টোকাই থেকে যায়—
… নেতাদের
পক্ষের মিছিলে নাচতে নাচতে সে ভেবেছিল বোধ হয়
সহজেই নাগরিক হয়ে যাবে; কিন্তু কোনো কিছুই তার
মতো করে হয়ে ওঠেনি।

তবে শেষ পর্যন্ত কবি মার্কসবাদ বা কোনো তত্ত্বে আশ্রয় খোঁজেননি। কোনো তত্ত্ব বা মতবাদের পক্ষে কথাও বলেননি। নিজের ভাবনাকে পাঠকের কাছে ছড়িয়ে দিয়েছেন শুধু।
প্রকাশে কবি পুরোদস্তুর রোমান্টিক। নিখাদ প্রেমের কবিতা আছে অনেকগুলো। সেগুলোয় পেঁজা তুলোর মতো ভালোবাসা ভাসতে থাকে—
খুব মনে পড়ে গেলে ধরে নিই আজ বুঝি তোমারই দিন
আমারই উঠোনে ওড়াতে এসেছ
তোমার খোলামন চুল
আমার আকাশে নীল ভাসিয়ে, সাজিয়ে নিয়েছ যে আশ্বিন
তার মন ছুঁয়ে দিয়ে দেব সব ভোরের শিউলি ফুল। (হৃদয়খানি পড়ো)
কবিতায় দেখা যায়, কবির নায়িকা প্রায়শ দূরে থাকে। তবে এজন্য কবির কোনো অনুযোগ নেই।

ভালোবাসার প্রবাহ কবির দিক থেকে বহমান থাকে। সেখানে নায়িকার প্রান্ত থেকে বিপরীত স্রোতের প্রকাশ নেই। তাই কবির ভালোবাসার স্রোতটি একাধারে প্রবল হয়ে বইতে থাকে।

পঙ্‌ক্তিবদ্ধ বাণী
কবিতায় কখনও কখনও পঙ্‌ক্তিগুলো বাণীর আকার পেয়েছে। গদ্য হলে এগুলোকে বলা যেত সুভাষিত উক্তি। কবিতায় বড়জোর একে আপ্তবাক্য বলা যায়। এই সক্ষমতা বড় কবিদের একটি বৈশিষ্ট্য। প্রায়শ সেটি দেখা দিয়েছে নর্মদা মিথুনের কবিতায়। নমুনা:
১. মীমাংসা হবে না জেনেও কাটিয়ে দেব—
অনায়াসে কাটাব একটা জীবন। (সমস্ত জীবন)
২. পাশে দাঁড়াবে না যখন লোকেরা
চোখে তাকাবে না যখন চোখেরা
জেনো, ডাকলেই আসব—আসবই (আস্থা)
৩. এখনো দিতে পারো তারে সবটুকু মন
যার চোখে জমে আছে জল—
অযুত সমুদ্র আর মেঘের।
(জয়শ্রীকে না-লেখা চিঠি)

কবিতার ভাষা ও ছন্দ
কবির সঙ্গে পাঠকের একাত্মবোধের সংযোগ তৈরি করে কবিতার ভাষা। এই ভাষা একদিকে কল্পনার জগৎ তৈরি করে, অন্যদিকে তৈরি করে কবিতার শিল্পসুষমা। দূরের বরফদেশের ভাষা এ দুই কাজই করতে পেরেছে। নর্মদা মিথুনের সহজাত কবিপ্রতিভা আছে বলেই এটি সম্ভব হয়েছে।
এ ছাড়া এ বইয়ের অনেক কবিতায় রয়েছে চটুল গীতল ছন্দ। ছন্দটি কবির প্রবৃত্তির মধ্যেই আছে। আছে বলেই এত সহজ করে বলার কথাটি বলতে পেরেছেন। নমুনা:
এক জোনাকি ধরতে গেলে
দুই জোনাকি দেয় যে ধরা
দুহাত মেলে আঁধার তাড়াই
আমার জোনাক লাগামছাড়া। (মনজোনাকি)
এই ছন্দের একটা প্রবল গতি আছে। গতির কারণে কখনও কখনও কবিতা শুরু হতে না হতেই শেষ হয়ে যায়—
এই যে এত
ভিড় জমেছে
লোকের পিছে
অন্য লোক
নিয়ম-টিয়ম
সব ভুলে আজ
তোমার আমার
গল্প হোক। (গল্প)

নর্মদা মিথুনের কবিতা পড়ে বোঝা যায়, তিনি কবিতার মধ্যে বাস করেন। প্রথম কাব্য হলেও তাঁর এই যাপন কবিতাগুলোকে শক্তি দিয়েছে। কবিতার মধ্য দিয়ে নিজেকে যতটুকু মেলে ধরেছেন, তার চেয়ে বেশি পাঠকের ডানা মেলার সুযোগ করে দিয়েছেন। নর্মদা মিথুনের পাঠক কবিতা পড়তে পড়তে তাই কবি হয়ে ওঠেন, নতুন কবিতার খোঁজ করেন।

তারিক মনজুর, অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন